বিশ্বজুড়ে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা, সামাজিক মূল্যবোধ ও সম্পর্কের ধরন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন ও নগরায়ণের প্রভাবে বদলে যাচ্ছে সমাজের প্রচলিত কাঠামো। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন ও মৌলিক সামাজিক প্রতিষ্ঠান পরিবারে। বিয়ে, দাম্পত্য সম্পর্ক, সন্তান লালন-পালন এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন আসায় পরিবারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পরিবারব্যবস্থা হয়তো বিলুপ্ত হবে না; তবে সময়ের সঙ্গে এর কাঠামো, ভূমিকা ও কার্যপদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, অর্থনৈতিক চাপ, পারস্পরিক অসহিষ্ণুতা, দাম্পত্য কলহ এবং বিয়ে সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহ এ পরিবর্তনের অন্যতম কারণ।যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বিয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ বিচ্ছেদে শেষ হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও বিবাহবিচ্ছেদের হার তুলনামূলক বেশি। এশিয়ার ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারকেন্দ্রিক সমাজেও বিয়ে ও দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিবর্তন দৃশ্যমান। দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও জাপানের মতো দেশে কম জন্মহার, বিয়ে না করার প্রবণতা এবং একাকী বসবাসের বিষয়টি সামাজিক ও জনমিতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।পরিবারব্যবস্থায় পরিবর্তনের কারণবিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক পরিবারব্যবস্থার সংকটের পেছনে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করছে।প্রথমত, দাম্পত্য সম্পর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধের ঘাটতি বাড়ছে। যৌতুক, পারিবারিক সহিংসতা, কর্তৃত্ববাদী মনোভাব এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন অনেক ক্ষেত্রে সংসার ভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও অসহিষ্ণুতা পারিবারিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলছে। নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্বাবলম্বিতা সমাজের ইতিবাচক অর্জন। তবে নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা, দায়িত্ব ভাগাভাগি ও শ্রদ্ধাবোধের অভাব দেখা দিলে দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়।তৃতীয়ত, আগের প্রজন্মের পারিবারিক কলহ, বিচ্ছেদ ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তরুণদের মধ্যে বিয়ে সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করছে। কেউ আইনি জটিলতা ও সামাজিক হয়রানির আশঙ্কায়, আবার কেউ ব্যক্তিস্বাধীনতা হারানোর ভয়ে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে জড়াতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছেন।ভবিষ্যতের পরিবার কেমন হতে পারেপরিবারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় কয়েকটি সম্ভাব্য প্রবণতা সামনে আসছে।লিভ-ইন ও চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক: কিছু সমাজে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই একসঙ্গে বসবাসের প্রবণতা বাড়ছে। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সম্পর্ক থেকে সহজে বেরিয়ে আসার সুযোগকে গুরুত্ব দেওয়ায় এ ধরনের সম্পর্কের বিস্তার ঘটতে পারে।একক অভিভাবকত্ব ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবার: কৃত্রিম প্রজনন প্রযুক্তি, আইভিএফ এবং দত্তক গ্রহণের সুযোগের ফলে একক অভিভাবকত্বের ধারণা বিস্তৃত হচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তির অগ্রগতি পারিবারিক সম্পর্কের ধরনেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।একাকী বসবাসের প্রবণতা: জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে একা বসবাসের প্রবণতা বাড়ছে। পরিবার গঠনের পরিবর্তে ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার, পোষা প্রাণী এবং প্রযুক্তিনির্ভর সঙ্গকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।পরিবার দুর্বল হলে কী প্রভাব পড়তে পারেপরিবার শুধু একসঙ্গে বসবাসের ব্যবস্থা নয়; এটি শিশুর মানসিক বিকাশ, সামাজিকীকরণ, নৈতিক শিক্ষা ও পারস্পরিক সহমর্মিতা গড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।পরিবারের বন্ধন দুর্বল হলে মানুষের মধ্যে একাকিত্ব ও মানসিক চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠা, আবেগীয় বিকাশ এবং সামাজিক মূল্যবোধ অর্জন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।এ ছাড়া বিয়ে ও সন্তান গ্রহণের প্রবণতা কমে গেলে জন্মহার হ্রাস, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংকোচন এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অনুপাত বৃদ্ধির মতো জনমিতিক সংকট তৈরি হতে পারে। ইতোমধ্যে পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ এ ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।পরিবার টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধাপরিবারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নারী-পুরুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা ও ন্যায়সংগত সম্পর্কের ওপর। পুরুষের কর্তৃত্ববাদী মনোভাব এবং নারীর প্রতি বৈষম্য যেমন পারিবারিক বন্ধন দুর্বল করে, তেমনি নারী-পুরুষ উভয়ের স্বার্থপরতা, অসহিষ্ণুতা ও দায়িত্ব এড়িয়ে চলার প্রবণতাও সম্পর্কের স্থায়িত্ব নষ্ট করে।নারীর স্বাধীনতা ও আর্থিক স্বাবলম্বিতা এবং পুরুষের মর্যাদা ও অধিকার—কোনোটিই পারিবারিক সম্পর্কের প্রতিপক্ষ নয়। বরং সমতা, সম্মান ও দায়িত্ব ভাগাভাগির ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে উঠলে পরিবার আরও শক্তিশালী হতে পারে।সব মিলিয়ে, আধুনিকতার চাপে পরিবারব্যবস্থা পরিবর্তিত হলেও এর সামাজিক গুরুত্ব কমে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা, নিরাপত্তা, সহমর্মিতা ও মানবিক সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না। তাই পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন প্রচলিত বৈষম্য ও কর্তৃত্ববাদী মনোভাব পরিহার করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায়বিচার ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে নতুন পারিবারিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা।তথ্যসূত্র: এ ইউ দৌলা, ‘আধুনিক সমাজে পরিবারব্যবস্থার অস্তিত্বের লড়াই’, যায়যায়দিন, ৬ নভেম্বর ২০২৬। মূল লেখায় আলোচিত আন্তর্জাতিক পরিবার ও বিবাহপ্রবণতার পরিসংখ্যানের স্বতন্ত্র প্রাথমিক উৎস উল্লেখ করা হয়নি।