স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে দুই দলের পৃথক প্রস্তুতি, জোটে দূরত্বের গুঞ্জন উড়িয়ে দিলেন নেতারাজামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় রাজনৈতিক ঐক্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অবস্থান এবং দুই দলের সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পৃথকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আলাদা প্রার্থী ঘোষণা এবং সর্বশেষ জোটের লংমার্চে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে এই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।তবে জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ নেতারা জোটে কোনো ধরনের ফাটল বা দূরত্বের বিষয়টি নাকচ করেছেন। তাঁদের দাবি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পৃথকভাবে অংশ নেওয়া দুই দলের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কৌশলের অংশ। এতে ১১ দলীয় ঐক্যের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না।ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত ১১ দলীয় জোটে যুক্ত হয় এনসিপি। নির্বাচনের পর সংসদ ও সংসদের বাইরের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দল দুটিকে একসঙ্গে দেখা গেছে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে পৃথক নির্বাচনি প্রস্তুতি নেওয়ায় তাদের রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।পৃথক নির্বাচনি প্রস্তুতি ঘিরে আলোচনাস্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এর মধ্যেই জামায়াতে ইসলামী সম্ভাব্য একক প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে নির্বাচনি প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একইভাবে এনসিপিও নিজস্ব প্রার্থী চূড়ান্ত করে দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে দুই দলের পৃথক প্রার্থী ঘোষণায় জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।জামায়াতে ইসলামী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিনকে এবং দক্ষিণে ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েমকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে।অন্যদিকে এনসিপি ঢাকা উত্তরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর আগে দলটি উত্তরে আরিফুল ইসলাম এবং দক্ষিণে আসিফ মাহমুদের নাম ঘোষণা করেছিল। পরে ভোটার এলাকা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রার্থী নির্ধারণে পরিবর্তন আনা হয়।ফাটলের অভিযোগ ভিত্তিহীন: এনসিপিএ বিষয়ে এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, ১১ দলীয় ঐক্য কিংবা জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির কোনো ধরনের ফাটল বা দূরত্বের গুঞ্জন সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। দুই দলের মধ্যে যা দৃশ্যমান হচ্ছে, তা মূলত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কৌশলের অংশ।তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনা, ফ্যাসিবাদের বিলোপ, গণহত্যার বিচার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে দুই দলের ঐক্য অটুট রয়েছে। তবে দল হিসেবে এনসিপির নিজস্ব পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে। নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং স্বতন্ত্র পরিচয়ে জনগণের কাছে পৌঁছানোই তাদের লক্ষ্য।আখতার হোসেন আরও বলেন, এনসিপি নিজস্ব কৌশলে রাজপথের কর্মসূচি ও নির্বাচনে অংশ নেবে। একইভাবে জামায়াতও তাদের নিজস্ব আদর্শ ও কৌশল অনুযায়ী নির্বাচন করবে। কোনো নেতা অসুস্থতা বা অন্য কারণে কর্মসূচিতে অংশ নিতে না পারলেই জোটে দূরত্ব তৈরি হয়েছে—এমন ধারণা সঠিক নয়।দূরত্ব নেই, আলোচনার দরজা খোলা: জামায়াতজামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদও দুই দলের মধ্যে দূরত্বের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।তিনি বলেন, একটি লংমার্চে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অংশ নিতে পারেননি। তিনি অসুস্থ থাকতে পারেন কিংবা অন্য কোনো সমস্যাও থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়ে কিছু গণমাধ্যম, সরকারদলীয় লোকজন ও জুলাইবিরোধীরা অযথা বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছে।হামিদুর রহমান আযাদের ভাষ্য, সংসদ ও সংসদের বাইরে দুই দল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পৃথকভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি থাকলেও এতে জোটের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।জোটের ভেতরে মতপার্থক্যের আভাসরাজনৈতিক মহলের মতে, সম্প্রতি এনসিপি দলীয় কমিটি পুনর্গঠন, নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং নিষ্ক্রিয় নেতাদের সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি জোটের বাইরে পৃথক কর্মসূচি ও নির্বাচনি প্রস্তুতির মাধ্যমে দলটি নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।তবে ১১ দলীয় ঐক্যের কয়েকজন নেতার মতে, বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে পৃথক অবস্থান জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। তাঁদের ধারণা, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নিলে জনপ্রিয় প্রার্থীকে সামনে রেখে জয়ের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিনও দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে বুধবার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে তিনি বলেন, দলের মধ্যে ভিন্নমত বা দ্বিমত থাকতেই পারে। কেউ জোটগত নির্বাচনের পক্ষে, আবার কেউ এককভাবে নির্বাচনের পক্ষে মত দিতে পারেন। সব মতামতকে সম্মান জানানো হয়। তবে এনসিপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো, দলটি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।সব মিলিয়ে, জামায়াত ও এনসিপির নেতারা প্রকাশ্যে ঐক্য অটুট থাকার কথা বললেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে দুই দলের পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান, প্রার্থী ঘোষণা এবং নেতৃত্বের উপস্থিতি নিয়ে তৈরি হওয়া আলোচনা ১১ দলীয় জোটের ভবিষ্যৎ সমন্বয়কে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।