এক দশকে জাফরান উৎপাদন কমেছে প্রায় ৬৮ শতাংশ, ভেজাল ও আমদানির দাপটে বিপাকে কৃষকরাভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী জাফরান চাষ অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, পানিসংকট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বাজারে ভেজাল জাফরানের দাপটে ক্রমেই কমছে মূল্যবান এই মসলার উৎপাদন। এতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জাফরান চাষের সঙ্গে যুক্ত কৃষকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। একই সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে কাশ্মীরের শত বছরের কৃষি ঐতিহ্য।বিশ্বের অন্যতম দামি মসলা জাফরান গাঢ় লাল রঙের জন্য ‘লাল সোনা’ নামে পরিচিত। ভারতের প্রধান জাফরান উৎপাদনকারী অঞ্চল পাম্পোরে একসময় বিস্তীর্ণ জমিতে এই মসলার চাষ হতো। কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারেও এখন প্রকৃত কাশ্মীরি জাফরানের সংকট দেখা দিয়েছে। এর সুযোগে আমদানি করা ইরানি জাফরান কাশ্মীরি পণ্য হিসেবে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।সম্প্রতি কাশ্মীর সফরে বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব সংকটের চিত্র উঠে এসেছে।এক দশকে উৎপাদন কমেছে ৬৮ শতাংশভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে জম্মু ও কাশ্মীরে জাফরানের উৎপাদন ছিল ৮ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৬ টনে। অর্থাৎ এক যুগের কিছু বেশি সময়ে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৬৮ শতাংশ।গবেষকদের মতে, উৎপাদন হ্রাসের অন্যতম কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। জাফরান গাছের কন্দের বিকাশ ও ফুল ফোটার জন্য আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের বৃষ্টিপাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ সময়ে বৃষ্টির অনিয়ম এবং দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া ফসলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।কাশ্মীরের জলবায়ু গবেষক ও অধিকারকর্মী রাবিয়া খানের মতে, জাফরান চাষের জন্য নির্দিষ্ট ঋতুভিত্তিক আবহাওয়ার ভারসাম্য প্রয়োজন। কিন্তু শরৎকালে বৃষ্টিহীন সময় দীর্ঘ হওয়া এবং তুষারপাতের ধরন পরিবর্তনের কারণে মাটির আর্দ্রতা ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে।পাম্পোরের কৃষকরাও আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি অনুভব করছেন। আগের মতো দীর্ঘ শীত না থাকায় বরফ গলে পাওয়া পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। ফলে চাষাবাদে সেচপাম্পের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।জাফরানচাষি আবদুল রশিদ ওয়ানি বলেন, গত কয়েক বছরে বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন জাফরান চাষে সেচপাম্পের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে।কৃষিজমি দখল করছে নগরায়ণজলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি জাফরান চাষের জমি কমে যাওয়াও বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক সম্প্রসারণ, আবাসন প্রকল্প ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের কারণে পাম্পোরের ঐতিহ্যবাহী জাফরানক্ষেত হারিয়ে যাচ্ছে।কোনিবাল গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা হাবিব খানের ভাষ্য, একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার জাফরান চাষের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু এখন অনেক তরুণ এ পেশায় ভবিষ্যৎ দেখছে না।এ ছাড়া সজারু ও ইঁদুরের আক্রমণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জাফরানের কন্দ। পাম্পোরের দুসু গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আসিফ জানান, সজারু রাতে জমির মাটি খুঁড়ে জাফরানের কন্দ নষ্ট করে দেয়। অন্যদিকে আবর্জনার ভাগাড়ের কারণে ইঁদুরের উপদ্রবও বেড়েছে। এতে অনেক জমিতে প্রত্যাশিত ফুল ফুটছে না।ফসল রক্ষায় কৃষকদের কোথাও অস্থায়ী বেড়া দিতে হচ্ছে, কোথাও রাত জেগে পাহারা দিতে হচ্ছে।কাশ্মীরি পরিচয়ে ইরানি জাফরান বিক্রির অভিযোগকাশ্মীরের জাফরান চাষের সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে ভেজাল ও ভুল পরিচয়ে পণ্য বিক্রি। বিশ্বের মোট জাফরান উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে ইরান থেকে। দেশটির জাফরানও খরা ও পানিসংকটের মতো জলবায়ুগত সমস্যার মুখে রয়েছে।তবে ভারতের বাজারে আমদানি করা ইরানি জাফরান নতুন মোড়কে কাশ্মীরি জাফরান হিসেবে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দিল্লির মসলা বাজারের এক ব্যবসায়ী বিবিসিকে জানান, আমদানি করা জাফরান অনেক সময় কাশ্মীরি পরিচয়ে বাজারজাত করা হয়। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে প্রকৃত পণ্য শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।এ ছাড়া জাফরানের সঙ্গে অন্য ফুলের আঁশ, হলুদ কিংবা ক্ষতিকর কৃত্রিম রং মিশিয়ে ভেজাল তৈরির ঘটনাও রয়েছে।জম্মু ও কাশ্মীরের খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার খাদ্যবিজ্ঞানী শাজিয়া মালিক বলেন, ভেজাল ও ভুল পরিচয়ে জাফরান বিক্রির কারণে ক্রেতাদের আস্থা কমছে। এতে প্রকৃত কৃষকরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।ভেজাল ঠেকাতে পণ্যের উৎস শনাক্তকরণে সনদ ও ইলেকট্রনিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, এসব উদ্যোগের বাস্তব প্রয়োগ এখনো পর্যাপ্ত নয়।সরকারি উদ্যোগেও কাটেনি সংকটজাফরান উৎপাদন বাড়াতে ২০১০ সালে ভারত সরকার ‘ন্যাশনাল স্যাফরন মিশন’ চালু করে। এর আওতায় সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, জাফরানের কন্দ পুনরুজ্জীবিত করা এবং কৃষকদের বৈজ্ঞানিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।পাম্পোরের বিভিন্ন এলাকায় গভীর নলকূপ ও স্প্রিংকলার সেচব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়। কিছু এলাকায় সেচসুবিধা বাড়লেও অনেক কৃষকের অভিযোগ, পানির পাইপলাইন নষ্ট, সরবরাহ অনিয়মিত এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মেরামতের কাজেও বিলম্ব হয়।অন্যদিকে শ্রীনগরের কাছে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জাফরান চাষ নিয়ে গবেষণা করছেন সরকারি উদ্যানতত্ত্ব গবেষক নিয়াজ আহমদ দার। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও আলোর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে বিশেষ কক্ষে জাফরান চাষের পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।গবেষকদের আশা, এ পদ্ধতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমিয়ে সুস্থ কন্দ সংরক্ষণ এবং নিয়মিত ফুল উৎপাদন সম্ভব হবে। প্রাথমিক গবেষণায় ফুল ফোটার ধারাবাহিকতা ও জাফরানের রঙের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্রোসিন উপাদানের মাত্রা ধরে রাখার ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।শুধু ফসল নয়, হারানোর শঙ্কা ঐতিহ্যেরওকাশ্মীরের জাফরান চাষ শুধু একটি কৃষিপণ্য উৎপাদনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা, পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। পাম্পোরের বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই চাষের ওপর নির্ভরশীল। ফসল তোলার মৌসুমকে কেন্দ্র করে তাদের সংসারের খরচ, বিয়ে ও অন্যান্য পারিবারিক আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাফরান সংগ্রহের মৌসুমে ভোর হওয়ার আগেই পরিবারের সদস্যরা মাঠে গিয়ে ফুল সংগ্রহ করেন। পরে সবাই মিলে ফুল থেকে লাল আঁশ আলাদা করেন। প্রায় চার হাজার ফুল থেকে মাত্র ২৮ গ্রাম জাফরান পাওয়া যায়। এ কারণে শ্রমসাধ্য এই মসলার উৎপাদন ব্যয়ও বেশি।দুসু গ্রামের কৃষক আসিফের আশঙ্কা, জাফরান চাষের জমি একবার ভবন ও স্থাপনার দখলে চলে গেলে সেখানে আবার চাষাবাদ ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। তার মতে, শত শত বছর ধরে জাফরান চাষ স্থানীয় মানুষের পরিচয়ের অংশ হয়ে রয়েছে। তাই কৃষকদের উদ্বেগ শুধু আয় কমে যাওয়া নয়, বরং নিজেদের ঐতিহ্য ও জীবনযাত্রা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও।জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, কৃষিজমি সংরক্ষণ, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভেজাল প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী জাফরান চাষ আরও সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে। এতে বিশ্বের অন্যতম সমাদৃত এই ‘লাল সোনা’ একসময় নিজ জন্মভূমিতেই বিরল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা/বিবিসি।