প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেশীয় ফার্নিচার উদ্যোক্তাদের স্মারকলিপি, কর্মসংস্থান ও শিল্পের স্বার্থ রক্ষার আহ্বানসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন দপ্তরে কাঠের আসবাবপত্রের পরিবর্তে প্লাস্টিকের বেঞ্চ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন দেশীয় ফার্নিচার শিল্পের উদ্যোক্তারা। তাঁদের আশঙ্কা, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দেশীয় কাঠ ও বোর্ডভিত্তিক ফার্নিচার শিল্পের উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয়ে সব ধরনের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে এসব দাবি তুলে ধরেন শিল্প-সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।স্মারকলিপিতে বলা হয়, বাংলাদেশের ফার্নিচার শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনমুখী ও শ্রমনির্ভর খাত। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কাঠমিস্ত্রি, কারিগর, শ্রমিক, পরিবেশক ও সরবরাহকারীরা এ খাতের ওপর নির্ভরশীল।প্লাস্টিকের বেঞ্চ ব্যবহারের নির্দেশনা নিয়ে উদ্বেগস্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কাঠের বেঞ্চের পরিবর্তে শ্রেণিভিত্তিক প্রোটোটাইপ অনুসারে দৃষ্টিনন্দন প্লাস্টিকের বেঞ্চ সরবরাহের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগকে।উদ্যোক্তাদের মতে, সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের আগে এর অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, কারিগরি ও শিল্পখাতের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব পর্যালোচনা করা জরুরি। কারণ, বিষয়টি কেবল আসবাবপত্রের উপকরণ পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দেশীয় শিল্পের উৎপাদন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা এবং লাখ লাখ মানুষের জীবিকার প্রশ্ন জড়িত।তাঁদের আশঙ্কা, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্লাস্টিকের ফার্নিচার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে এ খাতে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি বাজার তৈরি হবে। এতে কাঠ ও বোর্ডভিত্তিক ফার্নিচার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি ক্রয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ হারাতে পারে। ফলে শিল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা ঝুঁকিতে পড়বে।কাঠ ও প্লাস্টিকের বেঞ্চের তুলনামূলক মূল্যায়নের দাবিস্মারকলিপিতে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্তের ১৫ নম্বর ক্রমিকের নির্দেশনা বাস্তবায়নের আগে কাঠ ও প্লাস্টিকের বেঞ্চের স্থায়িত্ব, ব্যবহারযোগ্যতা, নিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব, মেরামতযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ব্যয় তুলনা করে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।উদ্যোক্তারা মনে করেন, কোনো একটি উপকরণকে এককভাবে প্রাধান্য না দিয়ে গুণগত মান, স্থায়িত্ব, ব্যবহার উপযোগিতা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও পরিবেশগত বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আসবাবপত্র কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।সরকারি ক্রয়ে সমান প্রতিযোগিতার আহ্বানস্মারকলিপিতে সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করে দরপত্র প্রক্রিয়ায় সব যোগ্য উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারীর সমান অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট উপকরণ বা উৎপাদনকারী গোষ্ঠীকে একচেটিয়া সুবিধা দেয়—এমন শর্ত বা নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করারও অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা।আবেদনকারীদের বক্তব্য, কাঠ, বোর্ড ও প্লাস্টিক—সব ধরনের আসবাবপত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা হলে সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার সম্ভব হবে। পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও কর্মসংস্থান সুরক্ষিত থাকবে।স্মারকলিপিতে প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্তটি চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা, উৎপাদনকারী, কারিগরি বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য অংশীজনের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাঁদের মতে, জাতীয় অর্থনীতি, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত মূল্যায়নের ভিত্তিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আসবাবপত্র ক্রয়ের নীতিমালা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।