শীতের সকালে স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলক বেড়ে যায়। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য শীতকাল বাড়তি সতর্কতার সময়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে শরীরের রক্তনালি সংকুচিত হয়, রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতাও প্রভাবিত হয়। এসব কারণে শীতকালে স্ট্রোকের আশঙ্কা প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।জ্যেষ্ঠ স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. চন্দ্রশেখর রেড্ডির বরাত দিয়ে নিউজ১৮-এর এক প্রতিবেদনে শীতকালে স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধির কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে।শীতে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ার পাঁচ কারণ১. রক্তচাপ বেড়ে যাওয়াশীতের সময় শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে ত্বক, হাত ও পায়ের রক্তনালি সংকুচিত হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ প্রক্রিয়াকে ভ্যাসোকনস্ট্রিকশন বলা হয়। এতে হৃদযন্ত্রকে রক্ত পাম্প করতে বেশি পরিশ্রম করতে হয় এবং সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত রক্তচাপ মস্তিষ্কের রক্তনালিতে চাপ সৃষ্টি করে। এতে রক্তনালি ফেটে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।২. রক্ত ঘন হওয়া ও জমাট বাঁধার প্রবণতাশীতকালে অনেকের তৃষ্ণা কম লাগে। ফলে পানি পান করার পরিমাণও কমে যায়। এতে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি ফাইব্রিনোজেন ও প্লেটলেটের পরিবর্তন রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে রক্তনালিতে জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ে, যা মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করতে পারে।৩. সকালে রক্তচাপের স্বাভাবিক বৃদ্ধিঘুম থেকে ওঠার পর শরীরে স্বাভাবিকভাবেই রক্তচাপ বাড়তে থাকে। এ সময় কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোনের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। এর সঙ্গে তীব্র শীত যুক্ত হলে রক্তনালির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পর্যাপ্ত গরম পোশাক ছাড়া ভোরে হাঁটতে বের হলে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ঝুঁকি বাড়তে পারে।৪. শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়াশীতের কারণে অনেকেই নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়াম কমিয়ে দেন। দীর্ঘ সময় শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকলে রক্ত সঞ্চালনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ ছাড়া শীতকালে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে ওজন ও কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসব বিষয় স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।৫. আগে থেকে থাকা শারীরিক জটিলতাঅনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা শীতকালে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। এসব রোগ রক্তনালির ক্ষতি করে রক্ত সঞ্চালনে সমস্যা তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়ায় ঝুঁকি বাড়ে। ধূমপান রক্তনালি সংকুচিত করে। যাঁদের আগে মিনি স্ট্রোক বা ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক (টিআইএ) হয়েছে, তাঁদেরও পুনরায় স্ট্রোকের আশঙ্কা রয়েছে।শীতে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে করণীয়বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, শীতকালে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে কিছু সতর্কতা মেনে চলা জরুরি।প্রচণ্ড ঠান্ডার সময়, বিশেষ করে ভোরে বাইরে হাঁটতে যাওয়া এড়িয়ে চলুন।তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় হলে হাঁটাচলা ও ব্যায়াম করুন।বাইরে বের হলে মাথা, কান ও ঘাড় গরম কাপড়ে ঢেকে রাখুন।তৃষ্ণা না পেলেও নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান করুন।উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করুন।চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন। নিজে থেকে কোনো ওষুধ বন্ধ করবেন না।স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা জরুরিস্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশের হাত-পা দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া কিংবা কথা বুঝতে অসুবিধা হলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।শীতের আবহাওয়ায় সচেতন জীবনযাপন, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।