টিকা ক্রয় ও বিতরণে বিলম্বের কারণ অনুসন্ধান, দায়ীদের চিহ্নিত করতে ৩ সদস্যের কমিশন গঠন; প্রতিবেদন দিতে হবে ৬০ কার্যদিবসেহামের টিকা ক্রয় ও বিতরণে বিলম্ব, অনিয়ম এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিশন গঠন করেছে সরকার। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা সংগ্রহ ও বিতরণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্টদের দায়দায়িত্বও খতিয়ে দেখবে কমিশন।বুধবার (৪ নভেম্বর) রাতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। ‘কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট, ১৯৫৬’-এর ৩ ধারায় গঠিত কমিশনের সভাপতি করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি মামনুন রহমানকে। কমিশনের অন্য দুই সদস্য হলেন বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনসের (বিসিপিএস) সভাপতি অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ এন এম মঈনুল ইসলাম।প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, হামের টিকা কেনা ও বিতরণে বিলম্বের কারণ, সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার জন্য কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দায়ী—এসব বিষয় অনুসন্ধান করবে কমিশন। তদন্তে চিহ্নিত দায়দায়িত্বের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশও করবে তারা।তদন্তের স্বার্থে কমিশন দেশের যেকোনো স্থান পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। প্রজ্ঞাপন জারির দিন থেকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ কমিশনকে প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা, জনবল ও ব্যয় নির্বাহের ব্যবস্থা করবে।টিকা কেনার পদ্ধতি পরিবর্তনে বিলম্বের অভিযোগহামের টিকা সংগ্রহে বিলম্বের অন্যতম আলোচিত কারণ কেনাকাটার পদ্ধতি পরিবর্তন। ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা সংগ্রহ করত। এ ক্ষেত্রে অর্থায়নের বড় অংশ আসত উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে।তবে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার টিকা কেনার ব্যয় রাজস্ব বাজেটের আওতায় এনে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। ক্রয়প্রক্রিয়ার এই পরিবর্তনের কারণে টিকা সংগ্রহে কতটা সময়ক্ষেপণ হয়েছিল এবং এর প্রভাব নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে কতটা পড়েছিল, তা কমিশনের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আন্দোলনের কারণে কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে।ইউনিসেফের আগাম সতর্কবার্তাটিকার সম্ভাব্য সংকট নিয়ে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।গত ২০ মে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, টিকার ঘাটতির আশঙ্কা তুলে ধরে ইউনিসেফ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি দিয়েছিল। এ বিষয়ে অন্তত ১০টি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে, ১০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে পাঠানো চিঠিতেও টিকার আসন্ন সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল।এতগুলো সতর্কবার্তা ও বৈঠকের পরও টিকা সংগ্রহে ঘাটতি কেন তৈরি হলো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।হামের প্রাদুর্ভাবে প্রাণহানি ১ হাজার ২৬৯চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা আক্রান্ত হয় বেশি। টিকার সংকট ও সময়মতো টিকাদান না হওয়ার অভিযোগের মধ্যে শিশুমৃত্যু বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে মোট ১ হাজার ২৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে ১০৫ জন। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ১৬৪ জনের। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৩২৫টি সন্দেহজনক সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। এতে সন্দেহজনক রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ১৪৮। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত সংক্রমণের সংখ্যা ২৪ হাজার ১৫০।গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ লাখ ৮ হাজার ৬৩৪ জন। তাঁদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৯৯ হাজার ৮৯৪ জন।প্রাদুর্ভাবের মধ্যে বর্তমান সরকার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেও সংক্রমণ ও মৃত্যু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে কত শিশু ছিল, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকার বিষয়টিও বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় এসেছে।এ পরিস্থিতিতে টিকা সংগ্রহ, মজুত, বিতরণ ও টিকাদান কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপে কী ধরনের ঘাটতি ছিল, সংশ্লিষ্টদের অবহেলা বা সিদ্ধান্তহীনতা সংকটকে কতটা বাড়িয়েছে—কমিশনের তদন্তে তার চিত্র উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।