বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। মৃত্যুর আগের রাতে উত্তরার একটি বারে তাহসিফের সঙ্গে বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশা ও বন্ধু শাহরিয়ার রেজা দীপের অবস্থান, পরে টঙ্গীর মাজার বস্তিতে যাত্রা এবং সেখান থেকে দীপের একা ফিরে আসার ঘটনা তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। রিমান্ডে দিশার দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, বারে দীপ তাহসিফকে বারবার মদ ঢেলে দিলেও নিজে পান করেননি।এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দিশা ও দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তাদের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, কললিস্ট ও বিভিন্ন ডিজিটাল তথ্য যাচাই করে মৃত্যুর আগের রাতের ঘটনাপ্রবাহ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। বিশেষ করে টঙ্গীর মাজার বস্তিতে প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থানের কারণ এবং সেখানে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দ্বিতীয় দফায় শাহরিয়ার রেজা দীপের আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এর আগে দিশা ও দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে দিশা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছু জানে না বলে দাবি করেছে। অন্যদিকে, দীপের বক্তব্যেও কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।বারে তিনজনের অবস্থান, মদ পান করেননি দীপতদন্ত সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফের সঙ্গে উত্তরার ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ যান দিশা। কিছুক্ষণ পর পৃথক মোটরসাইকেলে সেখানে পৌঁছান দীপ। পরে তিনজন একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা সেখানে অবস্থানের পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাঁরা বেরিয়ে যান।রিমান্ডে দিশা তদন্তকারীদের জানিয়েছে, বারে দীপ বারবার তাহসিফের গ্লাসে মদ ঢেলে দিচ্ছিলেন। তবে তিনি নিজে মদ পান করেননি। দিশার দাবি, পরে টঙ্গীতে যাওয়ার পথে তাহসিফ তাকে হেরোইন সেবনের প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি; বরং তাহসিফকে নিষেধ করেন।দিশা আরও জানিয়েছে, পরিচয়ের পর তাহসিফ তাকে দুইবার টঙ্গীর মাজার বস্তিতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তাহসিফ হেরোইন সেবন করতেন। দীপও নিয়মিত তাঁর সঙ্গে থাকতেন বলে দিশার দাবি।টঙ্গীর যাত্রা ঘিরে রহস্যতদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দিশাকে বাসায় নামিয়ে দেওয়ার পর তাহসিফ ও দীপের টঙ্গীর মাজার বস্তিতে যাত্রা। সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, তাঁরা সেখানে কী করেছিলেন এবং পরে তাহসিফের মোটরসাইকেল কেন মাজার বস্তিতে পড়ে ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ওই এলাকায় প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থান করেন তাহসিফ ও দীপ। পরে দীপ একা ফিরে আসেন। তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।ইয়াবা লেনদেনের তথ্যও তদন্তেতাহসিফের মৃত্যুর তদন্তে ‘আশা’ নামের আরেক তরুণীর বিষয়টিও সামনে এসেছে। রিমান্ডে দিশা জানিয়েছে, ওই নারীর সঙ্গে তাহসিফের ২০০ পিস ইয়াবা লেনদেনের বিষয়ে আলোচনা চলছিল। তবে এ বিষয়ে এর বেশি কিছু জানে না বলে দাবি করেছে সে।এ ছাড়া ডায়না নামের এক তরুণী ও তাঁর স্বামী রাসেলের বিষয়েও তথ্য দিয়েছে দিশা। তাঁদের উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরে একটি ট্রাভেল এজেন্সি রয়েছে বলে জানা গেছে। তাহসিফ, দীপ, আশা, ডায়না ও রাসেল একই সামাজিক পরিমণ্ডলে চলাফেরা করতেন। তাঁদের মধ্যে নিয়মিত আড্ডা হতো এবং কখনো মদ পানও করতেন বলে দিশার বক্তব্যে উঠে এসেছে। ট্রাভেল এজেন্সিতেও তাঁদের আড্ডা বসত।তদন্ত সূত্র জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আপাতত রাসেল, ডায়না ও আশার বিষয়ে খোঁজখবর রাখছেন তদন্তকারীরা।দুই পরিবারের বক্তব্যে ভিন্নতাতাহসিফের সঙ্গে দিশার সম্পর্কের বিষয়টি নিয়েও দুই পরিবারের বক্তব্যে ভিন্নতা পাওয়া গেছে।তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিমের দাবি, দিশা নিজেই তাঁর ছেলেকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল। তাহসিফ তাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতেন না। তবে দিশা তাঁকে বিরক্ত করত এবং তাঁর আচরণ সন্দেহজনক মনে হতো।অন্যদিকে, দিশার পরিবারের সদস্যদের দাবি, সে স্বভাবগতভাবে চুপচাপ ও শান্ত প্রকৃতির ছিল। ভাইবোন ও আত্মীয়দের মধ্যেও ভদ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। পরিবারের সঙ্গে খুব বেশি খোলামেলা কথা বলত না। এ কারণে তাহসিফের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টি প্রথম দিকে তাঁরা বুঝতে পারেননি।পরিবারের সদস্যরা জানান, একপর্যায়ে দিশার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করেন তাঁরা। বাসা থেকে বের হওয়ার জন্য কখনো শিক্ষার্থী পড়ানোর, আবার কখনো ছাদে যাওয়ার অজুহাত দিত সে। নিয়মিত তাহসিফের সঙ্গে দেখা করতে যেত এবং অনেক সময় রাতে দেরি করে ফিরত।বিষয়টি জানার পর পরিবার তাকে বাসায় আটকে রাখার চেষ্টা করে। গেটে তালা দেওয়া, মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া এমনকি তার মা একবার রাগ করে সিম কার্ড ভেঙে ফেলেন বলেও স্বজনেরা দাবি করেছেন। তবে তাহসিফের ফোন পেলে দিশা চাবি চুরি করে বাসা থেকে বেরিয়ে যেত বলে তাঁদের অভিযোগ।তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দিশা একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে চাকরি করত এবং শিক্ষার্থীদের পড়াত। প্রায় এক মাস আগে তাহসিফের সঙ্গে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর তার চাকরি চলে যায় বলে রিমান্ডে জানিয়েছে সে। তাহসিফের বাসায়ও কয়েকবার যাতায়াত ছিল দিশার। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল।মৃত্যুর আগের রাতের যোগাযোগ খতিয়ে দেখছে পুলিশনৌ পুলিশের মিডিয়া শাখার পুলিশ সুপার মাসুমা আক্তার বলেন, দিশা ও দীপের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়।তদন্তকারীরা এখন কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। দিশাকে বাসায় নামিয়ে দেওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ কেন টঙ্গীর মাজার বস্তিতে গিয়েছিলেন, সেখানে তাঁদের অবস্থানের প্রকৃত কারণ কী, তাহসিফের মোটরসাইকেল সেখানে ফেলে রাখা হলো কেন এবং দীপ ও দিশার বক্তব্যের মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।পাশাপাশি আশার সঙ্গে কথিত ইয়াবা লেনদেনের কোনো বাস্তব যোগসূত্র ছিল কি না, মৃত্যুর আগে তাহসিফ কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং ডায়না ও রাসেলসহ অন্যদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ধরন কী ছিল, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে উত্তরার রাজাবাড়ি ঘাট এলাকায় তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তাঁর বাবা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এরপর থেকেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু হয়।তবে বারে অবস্থান, মাদক সেবন, কথিত ইয়াবা লেনদেন কিংবা টঙ্গীর মাজার বস্তিতে যাতায়াতের তথ্য এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও তদন্তসূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সামনে এসেছে। এসব তথ্যের সত্যতা এবং তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।তথ্যসূত্র: ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, নৌ পুলিশ ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত।