প্রেমের সম্পর্ক থেকে বিয়ে—কখনো পরিবারের অমতে পালিয়ে, কখনো গোপনে, আবার পাত্র বা পাত্রী বিদেশে থাকলে ভিডিও কলেও বিয়ের আয়োজন করেন অনেকে। কারও ধারণা, দুই সাক্ষীর সামনে কবুল বললেই বিয়ে হয়ে যায়; কেউ আবার নোটারি পাবলিকের এফিডেভিটকেই বিয়ের আইনি স্বীকৃতি মনে করেন। কিন্তু ধর্মীয় বিধান ও বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে বিয়ের স্বীকৃতি, নিবন্ধন এবং প্রমাণের বিষয়গুলো এক নয়।বাংলাদেশে বিয়ে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধান ও রাষ্ট্রীয় আইন—দুই দিকই গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে সাক্ষী, বর-কনের সম্মতি এবং অন্যান্য ধর্মীয় শর্ত পূরণ করে বিয়ে সম্পন্ন হতে পারে। তবে শুধু কয়েকবার ‘কবুল’ বললেই সব ক্ষেত্রে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিয়ের নিবন্ধনও আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক।আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমনের মতে, মুসলিমদের বিয়ে নিবন্ধনের দায়িত্ব নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজির। নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে হলফনামা করলেই বিয়ে নিবন্ধিত হয় না। বিয়ের আইনি প্রমাণ হিসেবে কাবিননামা গুরুত্বপূর্ণ।এফিডেভিট করলেই কি বিয়ে বৈধ হয়?বাংলাদেশে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট করে বিয়ে করার কথা প্রায়ই শোনা যায়। তবে এফিডেভিট বিয়ে নিবন্ধনের বিকল্প নয়। আইনজীবীদের মতে, হলফনামা করলেই রাষ্ট্রীয়ভাবে বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে—এমন দাবি করা যায় না।মুসলিম বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী, মুসলিম আইনে সম্পন্ন প্রতিটি বিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। নিকাহ রেজিস্ট্রার নিজে বিয়ে পড়ালে তাৎক্ষণিক নিবন্ধনের বিধান রয়েছে। অন্য কেউ বিয়ে পড়ালে বরকে ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছে তা নিবন্ধনের জন্য জানাতে হয়। এ বিধান লঙ্ঘন করলে শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে নিবন্ধন না হওয়া মানেই ধর্মীয় শর্ত পূরণ করে সম্পন্ন হওয়া বিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল—এমন সিদ্ধান্তও আইন থেকে সরাসরি টানা যায় না। <Cite refs={["turn218350search0","turn218350search10","turn218350search8"]}/>আইনজীবীদের মতে, নিবন্ধন না থাকলে বিয়ের প্রমাণ, দেনমোহর, ভরণপোষণ, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারসহ বিভিন্ন অধিকার প্রতিষ্ঠায় জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই বিয়ের পর কাবিননামা বা নিবন্ধনের সনদ সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা জরুরি।বিয়েতে বয়স ও সম্মতি জরুরিবাংলাদেশের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, বিয়ের ক্ষেত্রে পুরুষের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর এবং নারীর ১৮ বছর। বর-কনের সম্মতিও গুরুত্বপূর্ণ; জবরদস্তি বা চাপ প্রয়োগ করে বিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বয়স গোপন করে বিয়ে বা নিবন্ধনের চেষ্টা আইনি জটিলতা ও শাস্তির কারণ হতে পারে। <Cite refs={["turn218350search38"]}/>পালিয়ে বা গোপনে বিয়ে করলে কী হবে?পরিবারের অমতে বিয়ে করার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধান নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিয়েতে অভিভাবকের উপস্থিতি বা সম্মতি বাধ্যতামূলক কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে।ঢাকার উত্তরা এলাকার কাজি অফিসে বিয়ে পড়ানোর কাজে যুক্ত আহসান উল্লাহ মাসুক বলেন, ইসলামি বিধান অনুযায়ী বিয়েতে সাক্ষী, বর-কনের সম্মতি এবং দেনমোহর নির্ধারণের বিষয় রয়েছে। তবে গোপনে বা পালিয়ে বিয়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় মতভেদ থাকায় সংশ্লিষ্ট আলেমের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।শুধু তিনবার কবুল বললেই কি বিয়ে হয়?বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুধু তিনবার ‘কবুল’ বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কাজি অফিসসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিয়ের প্রস্তাব, বর-কনের সম্মতি, সাক্ষীর উপস্থিতি এবং দেনমোহর নির্ধারণসহ প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে হয়। ধর্মীয়ভাবে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর তা আইন অনুযায়ী নিবন্ধন করাও জরুরি।ভিডিও কলে বিয়ের বৈধতা নিয়ে মতভেদবিদেশে থাকা পাত্র বা পাত্রী দেশে ফিরতে না পারলে কখনো ভিডিও কলের মাধ্যমে বিয়ের আয়োজন করা হয়। এ ধরনের বিয়ের ধর্মীয় বৈধতা নিয়ে ইসলামি আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।আহসান উল্লাহ মাসুকের মতে, ভিডিও কলে বর-কনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া এবং সাক্ষীদের উপস্থিতিসহ বিয়ের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিছু সমসাময়িক আলেম নির্দিষ্ট শর্তে এ ধরনের বিয়েকে বৈধ বলে মনে করেন। তবে ভিডিও কলে বিয়ে সম্পন্ন হলেও নিবন্ধনের প্রক্রিয়া কীভাবে আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন হবে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।কাজি অফিসসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, বর বা কনের অনুপস্থিতিতে অন্য কেউ কাগজে স্বাক্ষর করলে পরবর্তী সময়ে বিয়ে অস্বীকার করা বা স্বাক্ষর নিয়ে বিরোধ দেখা দিতে পারে। এতে বিয়ের প্রমাণ ও নিবন্ধন নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই এ ধরনের বিয়ের আগে নিবন্ধনের পদ্ধতি সংশ্লিষ্ট নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।ভিন্ন ধর্মের মানুষের বিয়ের আইনভিন্ন ধর্মের দুজন মানুষের বিয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২-এর কথা আলোচনায় আসে। তবে এ আইন সব ধর্মের যেকোনো দুই ব্যক্তিকে নিজ নিজ ধর্ম বজায় রেখে বিয়ের সাধারণ সুযোগ দেয় না। আইনের আওতা নির্দিষ্ট; কারা এ আইনে বিয়ে করতে পারবেন, তা আইনের শর্তের ওপর নির্ভর করে।আইনটির ১০ ও ১১ ধারা অনুযায়ী, নির্ধারিত পদ্ধতিতে রেজিস্ট্রারের সামনে তিনজন সাক্ষীসহ ঘোষণা ও বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। তাই ভিন্ন ধর্মের দুজনের বিয়ের ক্ষেত্রে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। <Cite refs={["turn218350search3","turn218350search2","turn218350search1"]}/>বিয়ের আগে যে বিষয়গুলো নিশ্চিত করবেনবর ও কনের আইন নির্ধারিত বয়স পূর্ণ হয়েছে কি না।উভয়ের সম্মতি স্বেচ্ছায় নেওয়া হয়েছে কি না।ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শর্ত ও সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে কি না।সংশ্লিষ্ট নিবন্ধিত রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে বিয়ে নিবন্ধনের ব্যবস্থা রয়েছে কি না।নিবন্ধনের পর কাবিননামা বা বিয়ের সনদ সংগ্রহ করা হয়েছে কি না।বিয়ে শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর অধিকার, দেনমোহর, ভরণপোষণ, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত। তাই শুধু কবুল বলা, ভিডিও কল বা এফিডেভিটের ওপর নির্ভর না করে ধর্মীয় শর্ত পূরণের পাশাপাশি প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিয়ে নিবন্ধন করাই নিরাপদ।তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা, ৩ নভেম্বর ২০২৬; মুসলিম বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪; বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭; বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২।