রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যমের প্রধান শক্তি হলো সত্য প্রকাশের সাহস। আর সেই সাহসের মূল চালিকাশক্তি সাংবাদিক। সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধ ও বৈষম্যের চিত্র জনসম্মুখে তুলে ধরাই তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে আজও সাংবাদিকদের হামলা, মামলা, হুমকি, হয়রানি ও নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁদের জীবনও বিপন্ন হচ্ছে।২ নভেম্বর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারহীনতার অবসান দিবস। ২০১৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। দিনটির মূল লক্ষ্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা এবং তাঁদের নিরাপদে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ তৈরি করা।একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকের স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিক সমাজের দাবি নয়; এটি সাধারণ মানুষের জানার অধিকার ও গণতন্ত্রের অন্যতম পূর্বশর্ত। কারণ সাংবাদিক যখন ভয়ভীতি ছাড়া সংবাদ প্রকাশ করতে পারেন, তখনই রাষ্ট্রের অনিয়ম, প্রশাসনের দুর্বলতা এবং ক্ষমতাবানদের অপকর্ম জনসমক্ষে আসে। সাংবাদিকের কণ্ঠরোধ করা মানে জনগণের তথ্য জানার অধিকারকে সংকুচিত করা।কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি কিংবা অসাধু চক্রের অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলেই সাংবাদিককে নানাভাবে চাপে ফেলার চেষ্টা করা হয়। কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, কখনো মিথ্যা মামলার ভয়, আবার কখনো সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকের ওপর হামলা চালানো হয়। এসব ঘটনা শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর আঘাত নয়, বরং স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত।সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সাংবাদিকদের ওপর সংঘটিত অপরাধের অনেক ঘটনার যথাযথ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয় না। অপরাধীরা রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে গেলে নতুন করে অপরাধ করার সাহস পায়। এভাবে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলতে থাকলে সাংবাদিকদের মধ্যে ভীতি তৈরি হবে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হবে এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সত্য আড়ালেই থেকে যাবে।তবে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পাশাপাশি পেশাগত দায়িত্বশীলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে হবে। ব্যক্তিগত বিরোধ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা কিংবা যাচাইহীন তথ্যকে সাংবাদিকতার নামে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ নেই। স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি জবাবদিহিও সাংবাদিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিটি অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। হামলা, হুমকি, মিথ্যা মামলা ও হয়রানির সঙ্গে জড়িতদের পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, পেশাগত সুরক্ষা, আইনি সহায়তা এবং দায়িত্ব পালনের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।বিশেষ করে জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত সাংবাদিকেরা নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, অপরাধী চক্র কিংবা ক্ষমতাসীনদের চাপের মুখেও তাঁদের অনেক সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে হয়। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে তৃণমূল পর্যায়ের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র আড়ালেই থেকে যাবে।আমরা মনে করি, সাংবাদিকের নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি তাঁর পেশাগত অধিকার। সংবাদ প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিককে যেন প্রাণের ঝুঁকি নিতে না হয়। সত্য প্রকাশের অপরাধে কাউকে যেন নির্যাতিত হতে না হয়। সাংবাদিকের কলম যেন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ভয়ে থেমে না যায়।২ নভেম্বরের এই আন্তর্জাতিক দিবসে আমাদের প্রত্যাশা—সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত প্রতিটি অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হোক। সাংবাদিকেরা ভয়ভীতি ও চাপমুক্ত পরিবেশে দায়িত্ব পালন করুন।কারণ সাংবাদিক নিরাপদ থাকলে সংবাদমাধ্যম স্বাধীন থাকে, আর সংবাদমাধ্যম স্বাধীন থাকলে জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করুন, সাংবাদিকের নিরাপত্তা দিন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটান।