ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে কাতারের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনা চললেও সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা কাটেনি। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের জব্দ করা ৬০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ ছাড় এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পথ তৈরির চেষ্টা চলছে। তবে সমঝোতার অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।রোববার কাতারের রাজধানী দোহায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা তৃতীয় দিনে গড়ায়। কাতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করছে। আলোচনায় ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড়ের বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরুর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।আগামী মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই সমঝোতা হতে পারে—এমন আশা থাকলেও আলোচনার ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত’সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেছেন, নতুন করে উত্তেজনা বাড়ানো ইরান কিংবা তার প্রতিবেশী কোনো দেশের স্বার্থে নয়। তবে পরিস্থিতির অবনতি হলে তার মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো।তিনি বলেন, ‘আমরা আগেও যেমন দেখিয়েছি, এবারও সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছি।’গারগাশ আরও বলেন, ইরান তাদের প্রতিবেশী এবং দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান দীর্ঘস্থায়ী সংকটে জড়িয়ে পড়ুক, তা তারা চান না।জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরও মধ্যস্থতা অব্যাহতহরমুজ প্রণালির কাছে পাকিস্তানগামী কাতারের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) জাহাজে শুক্রবার অজ্ঞাতপরিচয় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে তেহরান জাহাজটিকে চলাচলের অনুমতি ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনার পরও কাতারের মধ্যস্থতামূলক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট কাটাতে কাতার এমন একটি সমঝোতার চেষ্টা করছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ার সঙ্গে ইরানের হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও পরমাণু আলোচনা শুরুর বিষয়গুলো যুক্ত করা যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ প্রক্রিয়ার সময়সীমা সাত দিন থেকে কমিয়ে দুই দিনে আনতে সম্মত হয়েছে ইরান।কূটনীতির আহ্বান আরাগচির, সরাসরি আলোচনায় অনাগ্রহইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত অন্য পথের পরিবর্তে কূটনীতিকে বেছে নেওয়া। ওয়াশিংটনের ‘যুক্তিবোধের’ ওপর নির্ভর করে ইরান প্রতিরক্ষা ও কূটনীতি—দুই পথের জন্যই প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও জানিয়েছেন ইরানের এই মন্ত্রী।দোহার মধ্যস্থতামূলক আলোচনায় সরাসরি অংশ নিচ্ছেন না আরাগচি। সোমবার তাঁর তুর্কমেনিস্তান যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে ইরানের অন্য কূটনীতিকেরা দোহার আলোচনায় সক্রিয় রয়েছেন।শনিবার আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, তেলবাহী জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নেওয়া, ইরানের সম্পদ ছাড়ের পথে বাধা দূর করা এবং দেশটির তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে দুই দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান।ট্রাম্পের দাবি, পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি তেহরানেরএর আগে শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় একটি অংশ ধ্বংস করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এখনো এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবস্থা নেওয়া বাকি রয়েছে বলে জানান তিনি। এ ধরনের হামলা হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা ‘ভালোভাবেই চলছে’ বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরানকে খুব একটা নির্ভরযোগ্য মনে করেন না বলেও জানান তিনি।শনিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, কূটনৈতিক সমাধানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি জানান, আলোচনা পুনরায় শুরুর বিষয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাছ থেকে একটি চিঠি পেয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্যের সুরে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করেছেন বলেও জানান রেজায়ি। তবে চিঠির জবাব এখনো দেননি তিনি।পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় অনড় তেহরানকূটনৈতিক তৎপরতা চললেও ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার বিষয়ে তেহরানের অবস্থানে অনড় থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দেশটির পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার আলী নিকজাদ জানিয়েছেন, পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে রাজি নয় ইরান।তিনি বলেন, ইরানি জনগণ যেকোনো পরিস্থিতি বা চাপের মুখেও পরমাণু ইস্যুতে আলোচনা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা এবং বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে তেহরানের আস্থায় সংকট তৈরি হয়েছে।অন্যদিকে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান রেজায়ি দাবি করেছেন, ট্রাম্প এমন এক যুদ্ধের চাপে রয়েছেন, যার আন্তর্জাতিক প্রভাব ভিয়েতনাম যুদ্ধের চেয়েও বিস্তৃত। শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর কারণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ট্রাম্পকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে।হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা, জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের মধ্যে কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনা কতটা এগোয়, এখন সেদিকেই নজর উপসাগরীয় দেশগুলোর।