সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডেটিং অ্যাপে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে। ভুয়া পরিচয়, মিথ্যা ভালোবাসা, অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও প্রকাশের হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল—বিভিন্ন কৌশলে মানুষকে ফাঁদে ফেলছে প্রতারক চক্র। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের অনলাইন যোগাযোগের সুযোগ কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা আবেগকে পুঁজি করে আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে ভুক্তভোগীদের।স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তারের ফলে ঘরে বসেই নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি টিন্ডার, বাম্বল ও ট্যানট্যানের মতো ডেটিং অ্যাপেও বাড়ছে ব্যবহারকারীর সংখ্যা। কেউ বন্ধুত্ব, কেউবা জীবনসঙ্গী খোঁজার আশায় এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন। কিন্তু এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একশ্রেণির অনলাইন প্রতারক।প্রেমের সম্পর্ক গড়েই অর্থ আদায়প্রতারকেরা প্রথমে ভুয়া পরিচয়ে ডেটিং অ্যাপ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রোফাইল তৈরি করে। আকর্ষণীয় ছবি ও কথাবার্তার মাধ্যমে অন্যের বিশ্বাস অর্জন করে নিয়মিত যোগাযোগ শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই ভালোবাসা বা গভীর সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়ে ভুক্তভোগীকে আবেগগতভাবে নির্ভরশীল করে তোলার চেষ্টা করে।একপর্যায়ে নানা অজুহাতে অর্থ দাবি করা হয়। কেউ অসুস্থতার কথা বলে, কেউ বিপদের গল্প শোনায়। আবার কেউ বিদেশ থেকে দামি উপহার পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাস্টমস বা ডেলিভারি খরচের নামে টাকা চায়। সম্পর্কের প্রতি বিশ্বাস থেকে অনেকেই অর্থ পাঠিয়ে দেন। পরে প্রতিশ্রুত উপহার না আসা কিংবা কথিত সমস্যার সমাধান না হওয়ায় প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসে। একপর্যায়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় প্রতারক।ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে ব্ল্যাকমেইলঅনলাইন প্রেমের নামে প্রতারণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল। ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে প্রতারকেরা ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও কিংবা স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহ করে। কখনো ভিডিও কলের সময় গোপনে স্ক্রিন রেকর্ড করা হয়।পরে এসব ছবি বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে অর্থ দাবি করা হয়। সামাজিক সম্মান ও পারিবারিক মর্যাদা হারানোর ভয়ে অনেকে আতঙ্কিত হয়ে প্রতারকদের টাকা দিতে বাধ্য হন। কিন্তু একবার অর্থ দেওয়ার পরও প্রতারকদের দাবি শেষ হয় না। বরং নতুন অজুহাতে আবারও অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলে।যেভাবে চিনবেন ভুয়া প্রোফাইলঅনলাইনে পরিচিত হলেই কাউকে বিশ্বাস করা ঝুঁকিপূর্ণ। কয়েকটি লক্ষণ দেখে প্রতারণার আশঙ্কা সম্পর্কে সতর্ক হওয়া যায়। যেমন—প্রোফাইলে খুব কম ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য থাকা।অল্প পরিচয়েই প্রেম, বিয়ে কিংবা গভীর সম্পর্কের প্রস্তাব দেওয়া।দ্রুত ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও চাওয়া।পরিচয়ের শুরুতেই টাকা বা আর্থিক সহায়তা চাওয়া।সরাসরি দেখা কিংবা ভিডিও কলে কথা বলতে নানা অজুহাত দেখানো।বিদেশ থেকে উপহার পাঠানোর কথা বলে কাস্টমস বা ডেলিভারি খরচ দাবি করা।কথাবার্তায় অসংগতি থাকা কিংবা পরিচয় সম্পর্কে বারবার তথ্য পরিবর্তন করা।এ ধরনের আচরণ দেখা গেলে সতর্ক হওয়া এবং ব্যক্তির পরিচয় যাচাই না করে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য বা আর্থিক লেনদেন না করাই নিরাপদ।বাংলাদেশেও প্রতারণার অভিযোগ, গ্রেপ্তার একাধিকবাংলাদেশেও ডেটিং অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রতারণার ঘটনা সামনে আসছে। ফেসবুক, ইমোসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয়ে সম্পর্ক গড়ে অর্থ আদায়, অপহরণ, আটকে রাখা এবং ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) একজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নারী সদস্যের ছবি ও ভিডিও তৈরি করেন এবং নিজেকে নারী সেনাসদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। পরে ফেসবুক ও ইমোর মাধ্যমে ইতালিপ্রবাসী এক তরুণের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে প্রায় সাত লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।এরপর ২৫ অক্টোবর রাজধানীর তুরাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে হানিট্র্যাপ ও ব্ল্যাকমেইল চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশের অভিযোগ, চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয়ে বিত্তশালী পুরুষদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলত। পরে নির্দিষ্ট বাসা বা হোটেলে ডেকে আটকে রেখে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ধারণ করত। এসব ছবি ও ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হতো।সতর্কতাই হতে পারে সুরক্ষাঅনলাইন যোগাযোগের ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি সচেতনতার গুরুত্বও রয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে কাউকে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও, ঠিকানা, আর্থিক তথ্য কিংবা পাসওয়ার্ড দেওয়া উচিত নয়। অনলাইনে পরিচিত কারও কাছে অর্থ পাঠানোর আগে তার পরিচয় ও দাবির সত্যতা যাচাই করা জরুরি।কেউ ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশের হুমকি দিলে আতঙ্কিত হয়ে অর্থ না দিয়ে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট, কথোপকথন ও লেনদেনের প্রমাণ সংরক্ষণ করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।ডিজিটাল যোগাযোগ মানুষের পরিচিতি ও সম্পর্ক গড়ার সুযোগ বাড়িয়েছে। তবে সেই সুযোগ যেন প্রতারণা ও অপরাধের হাতিয়ারে পরিণত না হয়, সে জন্য ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর নজরদারিও জরুরি।তথ্যসূত্র: পিবিআইয়ের ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর গ্রেপ্তারসংক্রান্ত তথ্য; গোয়েন্দা পুলিশের ২৫ অক্টোবর ২০২৬-এর অভিযানসংক্রান্ত তথ্য।বিভাগ: প্রযুক্তি / অপরাধ।