ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, তাপপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম পূর্বাভাস দিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। বিপুল পরিমাণ আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য দুর্যোগের ঝুঁকি শনাক্ত করতে সক্ষম এ প্রযুক্তি। প্রচলিত আবহাওয়া বিজ্ঞানের সঙ্গে এআইয়ের সমন্বয় ঘটানো গেলে বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এআইয়ের ব্যবহার এখন শুধু ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ নির্ণয়ে সীমাবদ্ধ নেই। অতিবৃষ্টি থেকে বন্যার আশঙ্কা, তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব, প্রবল বাতাস, শৈত্যপ্রবাহ এবং কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসেও এ প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে।কোনো অঞ্চলে কয়েক দিন ধরে অতিবৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে আগাম পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা প্রস্তুত, বাঁধের নিরাপত্তা নিশ্চিত, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত এবং জরুরি সেবার পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব। একইভাবে তাপপ্রবাহের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে হাসপাতাল, কর্মক্ষেত্র ও জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগেই সতর্ক করা যেতে পারে।তবে এসব পূর্বাভাস কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট এলাকার বন্যার মানচিত্র, নদীর পানির স্তর, জনবসতি ও অন্যান্য স্থানীয় তথ্যের সঙ্গে এআইয়ের বিশ্লেষণ মিলিয়ে দেখা জরুরি।একাধিক সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণএআইভিত্তিক পূর্বাভাসের অন্যতম সুবিধা হলো, এটি একটি দুর্যোগের সম্ভাব্য বিভিন্ন গতিপথ ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে পারে।উদাহরণ হিসেবে, কোনো ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে একটি মডেল ৫০টি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে পারে। অধিকাংশ পরিস্থিতিতে ঝড়টি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের দিকে এগোলেও কয়েকটি বিশ্লেষণে অন্য এলাকায় আঘাত হানার আশঙ্কা দেখা যেতে পারে। এতে কর্তৃপক্ষ একটি সম্ভাব্য গতিপথের ওপর নির্ভর না করে একাধিক ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে পারে।তবে সব সম্ভাবনাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি পরিস্থিতির সম্ভাব্যতা ও ঝুঁকি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।প্রযুক্তির রয়েছে সীমাবদ্ধতাওআবহাওয়ার পূর্বাভাসে এআইয়ের অগ্রগতি থাকলেও প্রযুক্তিটির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বায়ুমণ্ডল একটি জটিল ও পরিবর্তনশীল ব্যবস্থা। এর সামান্য পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি করতে পারে।কোনো অঞ্চলে পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তথ্য অপর্যাপ্ত হলে কিংবা বিরল ও অস্বাভাবিক আবহাওয়ার পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক তথ্য না থাকলে এআই মডেলের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। আবার বৈশ্বিক পর্যায়ে ভালো ফল দেওয়া কোনো মডেল স্থানীয় পর্যায়ে একই মাত্রার নির্ভুলতা দেখাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।এ ছাড়া পূর্বাভাসের নির্ভুলতা এবং সতর্কবার্তার কার্যকারিতা এক বিষয় নয়। কোনো মডেল ঝড়ের গতিপথ সঠিকভাবে অনুমান করলেও সতর্কবার্তা সময়মতো মানুষের কাছে না পৌঁছালে ক্ষয়ক্ষতি কমানো কঠিন। অতিরিক্ত সতর্কবার্তা মানুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে ঝুঁকি কম করে দেখালে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।এ কারণে এআইয়ের পূর্বাভাস যাচাই, অনিশ্চয়তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং দায়িত্বশীল সতর্কবার্তা প্রচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।এআই ও আবহাওয়াবিদদের সমন্বয়ে ভবিষ্যৎবিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ভবিষ্যৎ এআই ও প্রচলিত আবহাওয়াবিজ্ঞানের সমন্বয়ের ওপর নির্ভরশীল। এআই দ্রুত বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরতে পারে। অন্যদিকে আবহাওয়াবিদরা বাস্তব পর্যবেক্ষণ, বায়ুমণ্ডলের ভৌত প্রক্রিয়া ও স্থানীয় অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এসব পূর্বাভাস যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।এ সমন্বয় কার্যকর হলে ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ, তীব্রতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—এমন এলাকা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সহজ হবে।প্রযুক্তিটির সাফল্য শুধু কত দ্রুত পূর্বাভাস তৈরি করা গেল, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বরং কত আগে নির্ভরযোগ্য সতর্কতা দেওয়া সম্ভব হলো, কত মানুষের কাছে তা পৌঁছাল এবং এর মাধ্যমে কতটা প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমানো গেল—সেটিই হবে সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি।বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে নির্ভরযোগ্য তথ্য, কার্যকর পরিকল্পনা ও সময়োপযোগী সতর্কবার্তার সঙ্গে এআই প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো গেলে তা দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।