কুমিল্লার গোমতী নদীর বিভিন্ন চরে ফের অবাধে মাটি কাটার অভিযোগ উঠেছে। রাতের আঁধারে গভীর গর্ত করে মাটি সরিয়ে নেওয়ায় হুমকিতে পড়েছে ফসলি জমি, গাছপালা ও নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারির অভাব এবং সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করেই চলছে মাটি কাটার এই তৎপরতা।কুমিল্লার গোমতী নদীর বিভিন্ন চরে শীত মৌসুম শুরুর আগেই আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে মাটি কাটার চক্র। কোথাও মাটির স্তর খাড়া করে কেটে নেওয়া হয়েছে, কোথাও তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত। এতে নদীর চর, আশপাশের ফসলি জমি ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের বেলা মাটি কাটা হয় না। গভীর রাতে ট্রলিতে করে মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে মাটি কাটার ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে এলাকাবাসীর মধ্যে।৩০ ফুট গভীর গর্ত, ঝুঁকিতে তালগাছগত মঙ্গলবার কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর এলাকার গোমতী নদীর চরে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৩০ ফুট গভীর এবং ২০০ ফুট দৈর্ঘ্য-প্রস্থের জায়গাজুড়ে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। এতে আশপাশের গাছপালা ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।মাটি কাটার কারণে চরের কিনারায় দুটি তালগাছ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। চারপাশের মাটি সরিয়ে নেওয়ায় যেকোনো সময় গাছ দুটি উপড়ে নদীতে পড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।জগন্নাথপুর এলাকার কয়েকজন যুবক বলেন, বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাত থেকে সুরক্ষায় তালগাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এভাবে মাটি কাটা অব্যাহত থাকলে গাছ দুটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।মাটি কাটার স্থান থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে ফুটবল খেলছিলেন কয়েকজন যুবক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা বলেন, যেভাবে মাটি কাটা হচ্ছে, তাতে কয়েক দিনের মধ্যেই তালগাছ দুটি পড়ে যেতে পারে।রাতের আঁধারে চলে মাটি সরানোজগন্নাথপুর এলাকার বাসিন্দা মমতাজ সরদার বলেন, দিনের বেলা মাটি কাটা হয় না। মধ্যরাতে মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হয়। কোথায় নেওয়া হয়, তা তাঁরা দেখেননি। এসব দেখভালের দায়িত্ব প্রশাসনের।স্থানীয়দের অভিযোগ, মাটি কাটার সঙ্গে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী জড়িত। তাঁদের আরও দাবি, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে ট্রাকপ্রতি মাসোহারা দিয়ে মাটি কাটার কাজ চলছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।বন্যার পর নিয়ন্ত্রণে এলেও ফের তৎপরতাস্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় কুমিল্লার দুই উপজেলার প্রায় ১০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। এরপর ২০২৫ সালে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের তৎপরতায় মাটি কাটার কার্যক্রম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে গত এক সপ্তাহে নদীর কয়েকটি স্থানে আবারও মাটি কাটতে দেখা গেছে।পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছরে এখনো কোনো কাজ শুরু হয়নি। কারা নদীর চর থেকে মাটি কেটে নিচ্ছে, সে বিষয়ে তাঁরা অবগত নন। তবে তাঁদের দাবি, সংরাইশ এলাকার শামসু মিয়ার ছেলে ইলিয়াস এই মাটি কাটার সিন্ডিকেটের প্রধান। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান কর্মকর্তারা।অনুমতি দেয়নি প্রশাসনআদর্শ সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাশিয়াত আক্তার বলেন, মাটি কাটার বিষয়ে এখনো তাঁদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। কেউ অবৈধভাবে মাটি কেটে থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, গোমতী নদীর চরে কারা মাটি কাটছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আলী রাজীব মাহমুদ মিঠুন বলেন, কাউকে গোমতী নদীর চর থেকে মাটি কাটার অনুমতি দেওয়া হয়নি।নদীর চর থেকে মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত, মাটি পরিবহনের পথ ও গন্তব্য নির্ধারণ এবং ফসলি জমি ও পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।