আজ ৩১ অক্টোবর, বিশ্ব নগর দিবস। পরিকল্পিত, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়। নগরায়ণের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, অপরিকল্পিত স্থাপনা, আবাসন সংকট ও নাগরিক দুর্ভোগ। তাই বিশ্ব নগর দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালনের দিন নয়, বরং আমাদের নগর ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নতুন করে পর্যালোচনা করারও দিন।একটি শহর বা নগর শুধু বহুতল ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আধুনিক স্থাপনার সমষ্টি নয়। একটি আদর্শ নগরের পরিচয় নির্ধারিত হয় সেখানকার মানুষের জীবনমান, নাগরিক নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার মাধ্যমে। যে নগরে মানুষ স্বস্তিতে চলাচল করতে পারে, নিরাপদে বসবাস করতে পারে এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধা পায়, সেই নগরই প্রকৃত অর্থে বাসযোগ্য।বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পিত উন্নয়নের ঘাটতি স্পষ্ট। শহর সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে উঠছে না পর্যাপ্ত সড়ক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পার্ক, খেলার মাঠ ও গণপরিবহন সুবিধা। সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত বাজার ও স্থাপনা, যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা এবং যানবাহনের চাপ নগরজীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাল, জলাশয় ও উন্মুক্ত স্থান ভরাটের প্রবণতা, যা পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।বিশেষ করে জেলা শহর, উপজেলা সদর ও ছোট-বড় পৌর এলাকায় পরিকল্পিত নগরায়ণের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা নির্মাণ কিংবা ভবন তৈরি নয়; উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোই এর মূল লক্ষ্য। কিন্তু অনেক এলাকায় সড়ক নির্মাণের পর ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। আবার কোথাও ফুটপাত ও সড়ক দখলের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। এসব সমস্যা সমাধানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলতা, জবাবদিহি ও কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।নগর পরিকল্পনায় পরিবেশের বিষয়টিও সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। নির্বিচারে গাছ কাটা, জলাশয় ভরাট এবং সবুজ জায়গা কমে যাওয়ার ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই প্রতিটি নগর পরিকল্পনায় পর্যাপ্ত গাছপালা, উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, খেলার মাঠ, জলাধার সংরক্ষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী, শিশু, নারী ও প্রবীণদের চলাচলের উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলাও জরুরি।এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, পরিবেশবিদ, ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকদের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং জনমতকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।আমাদের মনে রাখতে হবে, নগর উন্নয়নের নামে মানুষের ভোগান্তি বাড়ানো কিংবা প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করা কোনোভাবেই টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না। উন্নয়নের প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে জনবান্ধব, পরিবেশসম্মত ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ।বিশ্ব নগর দিবসে আমাদের প্রত্যাশা—দেশের প্রতিটি শহর, পৌরসভা ও উপজেলা সদর গড়ে উঠুক সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যানের আলোকে। অবৈধ দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, যানজট নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সবুজায়ন এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করুক।পরিকল্পিত নগর শুধু বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজন নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার। তাই নগর উন্নয়ন হোক মানুষের জন্য, পরিবেশের সুরক্ষায় এবং একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে।