অটিজম কোনো অভিশাপ নয়; বরং সঠিক সময়ে শনাক্তকরণ, বিশেষায়িত শিক্ষা, প্রয়োজনীয় থেরাপি ও পারিবারিক সহযোগিতা পেলে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুরাও নিজেদের সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ পায়। তাদের অনেকেই শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও উপযুক্ত সহায়তার মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় যুক্ত হতে পারে। তবে এ জন্য প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাসেবা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সমন্বিত ভূমিকা।ঢাকার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশু রাহির ঘটনা এর উদাহরণ। দুই বছর বয়সে তার বাবা-মা লক্ষ করেন, নাম ধরে ডাকলে সে সাড়া দেয় না, চোখে চোখ রাখে না এবং অন্য শিশুদের তুলনায় একা খেলতে বেশি পছন্দ করে। পাশাপাশি কথা বলতে দেরি এবং একই আচরণ বারবার করার প্রবণতাও দেখা যায়। পরে তিন বছর বয়সে বিশেষজ্ঞের কাছে নেওয়া হলে তার অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (এএসডি) শনাক্ত হয়।পরবর্তী সময়ে রাহিকে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের অধীন ‘স্পেশাল স্কুল ফর চিলড্রেন উইথ অটিজম’-এ ভর্তি করা হয়। সেখানে তার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা পরিকল্পনা (আইইপি) তৈরি করা হয়। এর আওতায় স্পিচ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, আচরণগত থেরাপি এবং দলীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে যোগাযোগ, দৈনন্দিন কাজ ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি তার বাবা-মাকেও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে শিশুর সঙ্গে সহায়ক আচরণ করার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।অটিজম কী ও কেন হয়অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার একটি স্নায়ুবিকাশজনিত অবস্থা। এতে সামাজিক যোগাযোগ, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া এবং আচরণে ভিন্নতা দেখা যায়। একই কাজ বারবার করা, নির্দিষ্ট বিষয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ এবং পরিবেশের শব্দ, আলো বা স্পর্শের প্রতি অস্বাভাবিক সংবেদনশীলতাও এর বৈশিষ্ট্য হতে পারে।অটিজম একটি স্পেকট্রাম অবস্থা হওয়ায় এর লক্ষণ ও সহায়তার প্রয়োজন ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। কেউ তুলনামূলক স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারে, আবার কারও দৈনন্দিন কাজ ও যোগাযোগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা প্রয়োজন হয়।অটিজমের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে জিনগত বৈশিষ্ট্য ও মস্তিষ্কের বিকাশের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। কিছু জেনেটিক অবস্থার সঙ্গে অটিজমের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। বাবা-মায়ের বেশি বয়স এবং গর্ভকালীন কিছু জটিলতাও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে টিকাদানের সঙ্গে অটিজমের কোনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সম্পর্ক নেই।যেসব লক্ষণে সতর্ক হতে হবেশিশুর বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়েই অটিজমের কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। বিশেষ করে ১৮ থেকে ৩৬ মাস বয়সের মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া।চোখে চোখ রেখে যোগাযোগে অনীহা।কথা বলতে দেরি হওয়া বা যোগাযোগে অসুবিধা।অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা ও সম্পর্ক তৈরিতে সমস্যা।একই কাজ বা অঙ্গভঙ্গি বারবার করা।নির্দিষ্ট বস্তু বা বিষয়ের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ।শব্দ, আলো, স্পর্শ বা বিভিন্ন অনুভূতির প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা কিংবা কম প্রতিক্রিয়া।এসব লক্ষণ দেখা দিলেই অটিজম নিশ্চিত বলা যায় না। শিশুর বিকাশগত মূল্যায়নের জন্য প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা ও প্রশিক্ষণ শুরু করা সম্ভব।দেশে সরকারি উদ্যোগ ও সেবার বিস্তারবাংলাদেশে অটিজম বিষয়ে সচেতনতা ও সেবা সম্প্রসারণে বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে দেশের ৬৪টি জেলা ও ৩৯টি উপজেলায় ১০৩টি অটিজম কর্নার চালু করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।এ ছাড়া সেনানিবাস এলাকায় ‘প্রয়াস’ নামে বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অটিজমসহ নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে।প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের কার্যক্রমও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের মাধ্যমে অটিজম নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে।চিকিৎসা নয়, প্রয়োজন সমন্বিত সহায়তাঅটিজমের বৈশিষ্ট্য দূর করার কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। তবে ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী স্পিচ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, আচরণগত সহায়তা, বিশেষায়িত শিক্ষা এবং সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।প্রতিটি শিশুর সক্ষমতা ও প্রয়োজন আলাদা। তাই একই ধরনের চিকিৎসা বা প্রশিক্ষণ সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিকল্পনার মাধ্যমে শিশুর যোগাযোগ, শেখা এবং দৈনন্দিন জীবনের দক্ষতা বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।শিশুর বিকাশে পরিবারের ভূমিকাঅটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর বিকাশে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মা-বাবা শিশুর আচরণ ও বিকাশের পরিবর্তন প্রথম পর্যায়ে সবচেয়ে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। শিশুর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, খেলাধুলা, দৈনন্দিন কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি এবং ধৈর্যশীল আচরণ তার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।পাশাপাশি অভিভাবকদেরও প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা প্রয়োজন। এতে শিশুর প্রয়োজন বুঝতে এবং বাড়িতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে তারা সক্ষম হন। অটিজম নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করতেও পরিবারের সদস্যদের সচেতন ভূমিকা জরুরি।প্রয়োজন আরও কার্যকর উদ্যোগবাংলাদেশে অটিজম বিষয়ে সচেতনতা ও সেবা কার্যক্রমে অগ্রগতি হলেও বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এখনো পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেক অভিভাবক শিশুর বিকাশগত সমস্যার লক্ষণ বুঝতে পারেন না কিংবা সামাজিক সংকোচের কারণে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে দেরি করেন।এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রাথমিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ সেবা সম্প্রসারণ, প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি এবং বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে।অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতির পাশাপাশি তাদের অধিকার, সক্ষমতা ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দিতে হবে। উপযুক্ত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে তারাও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে এ উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।তথ্যসূত্র: সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং দৈনিক আমার দেশ-এ প্রকাশিত মো. রফিকুল ইসলামের উপসম্পাদকীয় (৩০ অক্টোবর ২০২৬)।