নেত্রকোনার মদনে ১১ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আগামী ১১ নভেম্বর রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন আদালত। রায়ের আগে শুনানিতে নিজের সব সম্পদের বিনিময়ে মামলা থেকে মুক্তি চেয়েছেন মামলার প্রধান আসামি মাদ্রাসাশিক্ষক আমান উল্লাহ মাহমুদী ওরফে সাগর।বুধবার (২৮ অক্টোবর) নেত্রকোনা জেলা ও দায়রা জজ এবং শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. আব্দুছ সালামের আদালতে যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।সম্পদের বিনিময়ে মুক্তির আকুতিআদালত সূত্রে জানা গেছে, যুক্তিতর্ক শুনানির একপর্যায়ে বিচারকের অনুমতি নিয়ে বক্তব্য দেন আসামি সাগর। বিচারকের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তাঁর নামে ১২ শতাংশ জমি রয়েছে। মামলা থেকে মুক্তি পেতে জীবনের সব সম্পদ দিয়ে দেওয়ার আকুতিও জানান তিনি।দীর্ঘদিন কারাগারে থাকলে স্ত্রী ও সন্তানের দেখাশোনা এবং ভরণপোষণ কঠিন হয়ে পড়বে বলেও আদালতকে জানান তিনি।এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আনিসুর রহমান আপসের প্রসঙ্গ তুললে বিচারক তা নাকচ করে দেন। বিচারক জানান, তাঁরা কখনো আপসের বিষয়ে কথা বলেননি। শুনানির একপর্যায়ে ঘটনাস্থলের আশপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল কি না, তা-ও জানতে চান আদালত।একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগ, সর্বোচ্চ শাস্তি দাবিরাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. নূরুল কবীর রুবেল যুক্তিতর্কে বলেন, ভুক্তভোগী শিশুটিকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য, নথিপত্র ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।রাষ্ট্রপক্ষ আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছে। পিপি জানান, মামলার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যুক্তিতর্ক আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ সক্ষম হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।যেভাবে প্রকাশ পায় ঘটনামামলার নথি ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মদন উপজেলার কাইটাইল ইউনিয়নের পাঁচহার বড়বাড়ি এলাকার একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসায় পড়ত শিশুটি। ওই মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও শিক্ষক ছিলেন আমান উল্লাহ মাহমুদী ওরফে সাগর।অভিযোগ, মাদ্রাসায় থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করেন তিনি। পরে শিশুটির শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিলে পরিবারের সন্দেহ হয়। চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করানোর পর শিশুটির অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।এরপর গত ২৩ এপ্রিল শিশুটির মা বাদী হয়ে মদন থানায় মামলা করেন। মামলায় সাগরের পাশাপাশি তাঁর ভাই মাইমুন ওরফে মামুন মিয়াকেও আসামি করা হয়।মামলার পর আত্মগোপনে চলে যান সাগর। পরে ৬ মে ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। আদালত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণের নির্দেশ দেন আদালত।ডিএনএ পরীক্ষায় ৯৯.৯৯ শতাংশ মিলমামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে সামনে আসে ডিএনএ পরীক্ষার ফল। গত ২ জুলাই ভুক্তভোগী একটি কন্যাশিশুর জন্ম দেয়। পরে আদালতের নির্দেশে নবজাতক ও মামলার আসামি সাগরের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়।আগস্টে প্রকাশিত অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) চূড়ান্ত প্রতিবেদনে নবজাতকের সঙ্গে সাগরের ডিএনএর ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল পাওয়ার কথা জানানো হয়।এরপর ২৮ আগস্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মদন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আক্তারুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে শিক্ষক আমান উল্লাহ মাহমুদী ওরফে সাগর এবং তাঁর ভাই মাইমুন ওরফে মামুন মিয়াকে অভিযুক্ত করা হয়।১১ নভেম্বর রায়ের অপেক্ষাদীর্ঘ তদন্ত, আসামি গ্রেপ্তার, রিমান্ড, ডিএনএ পরীক্ষা ও অভিযোগপত্র দাখিলের পর মামলার যুক্তিতর্কও শেষ হয়েছে। এখন আদালতের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার।আগামী ১১ নভেম্বর রায় ঘোষণার দিন ধার্য রয়েছে। ওই দিন আদালতের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত শিশু ধর্ষণ মামলাটির বিচারিক পরিণতি নির্ধারিত হবে।