কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটি, অভিযোগ গ্রহণ সেল ও কালো তালিকা তৈরির সুপারিশকওমি মাদরাসায় শিশুদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি রক্ষা এবং জনসাধারণের আস্থা ধরে রাখতে ছয় দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছেন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটি গঠন, অভিযোগ গ্রহণের জন্য হটলাইন চালু, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, শিশু সুরক্ষায় অবকাঠামোগত পরিবর্তন এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য আচরণবিধি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।সোমবার (২৬ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক আহ্বানে তিনি কওমি মাদরাসাসংশ্লিষ্ট আলেম, শিক্ষক ও পরিচালকদের এসব বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, প্রস্তাবগুলো দেশের শীর্ষস্থানীয় ৩০ জন আলেমের কাছেও পাঠানো হয়েছে।শিশু নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগশায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে কওমি মাদরাসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এসব প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি এতিম, দুস্থ ও অসহায় শিশুদের খাদ্য, বস্ত্র, আবাসন ও চিকিৎসার ব্যবস্থাও করে থাকে।তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আবাসিক মাদরাসায় শিশুদের শারীরিক নির্যাতন, অমানবিক আচরণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সামনে আসায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, এসব অপরাধের অভিযোগকে গণমাধ্যমের অতিরঞ্জন বা ষড়যন্ত্রের অজুহাতে উপেক্ষা করা যাবে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।তিনি একই সঙ্গে বলেন, কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপানো যেমন অনুচিত, তেমনি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার নামে অপরাধ ধামাচাপা দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটি ও অভিযোগ গ্রহণ সেলের প্রস্তাবকওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অধীনে আলেম, আইনজীবী ও মনস্তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ। কোনো প্রতিষ্ঠানে গুরুতর শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে কমিটি দ্রুত সরেজমিনে তদন্ত করবে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সোপর্দ করার সুপারিশ করবে।অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয়সহ কেন্দ্রীয় কালো তালিকা তৈরির কথাও বলেছেন তিনি, যাতে তাঁরা অন্য কোনো মাদরাসায় চাকরি পেতে না পারেন। অন্যদিকে, অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দায়মুক্ত করার বিষয়টি প্রকাশ্যে জানানোর সুপারিশ করেছেন তিনি।পাশাপাশি ভুক্তভোগীরা যাতে গোপনীয়তা বজায় রেখে অভিযোগ জানাতে পারেন, সে জন্য হটলাইনভিত্তিক অভিযোগ গ্রহণ সেল গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এই সেল ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারকে মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা দেবে এবং তদন্ত কমিটির কাছে প্রতিবেদন ও সুপারিশ পেশ করবে।শিশু সুরক্ষায় অবকাঠামোগত পরিবর্তনমাদরাসার শ্রেণিকক্ষ, বারান্দা, নূরানি, হিফজ ও আবাসিক বিভাগে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ।তিনি কম বয়সী শিশুদের আবাসিক ব্যবস্থার পরিবর্তে পরিবারের তত্ত্বাবধানে রেখে মাদরাসায় যাতায়াতের মাধ্যমে পড়াশোনায় উৎসাহিত করার কথা বলেছেন। তবে এতিম ও আশ্রয়হীন শিশুদের জন্য বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা রাখার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।আবাসিক মাদরাসায় বিছানাগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত দূরত্ব রাখা এবং আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী পৃথক খাট বা চৌকির ব্যবস্থা করার প্রস্তাব রয়েছে তাঁর সুপারিশে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দিয়ে শিক্ষকদের কোনো ধরনের শারীরিক সেবা নেওয়া নিষিদ্ধ করে তা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে গুরুত্বশিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণবিষয়ক সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ। শিশু মনস্তত্ত্ব, শিশু সুরক্ষা আইন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ ও দায়িত্বশীল আচরণ বিষয়ে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করারও প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।শিক্ষক নিয়োগে শিক্ষাগত ও নৈতিক যোগ্যতার পাশাপাশি পরিপক্বতা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। বিশেষ করে নূরানি, হিফজ ও প্রাথমিক স্তরের শিশুদের তত্ত্বাবধানে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। শিক্ষকদের পারিবারিক জীবন স্বাভাবিক রাখতে সপরিবারে থাকার ব্যবস্থা এবং যৌক্তিক ছুটির পরিকল্পনা করার কথাও উল্লেখ করেছেন।বালিকা মাদরাসা ও অনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রস্তাববালিকা ও মহিলা মাদরাসার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম নারী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালনা এবং সম্ভব হলে এসব প্রতিষ্ঠান অনাবাসিক রাখার সুপারিশ করেছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ। আবাসিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তাবিধি অনুসরণের কথাও বলেছেন তিনি।এ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা মানহীন বেসরকারি মাদরাসার মান নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন ও তদারকির ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ এবং বেফাকুল মাদারিসসহ সংশ্লিষ্ট জাতীয় বোর্ডগুলো সচেতনতামূলক নির্দেশনা, নিবন্ধনের শর্ত এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারে।আত্মসংশোধনের আহ্বানশায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, মাদরাসাশিক্ষিত ব্যক্তিরাও ভুলের ঊর্ধ্বে নন। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তাঁদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। একই সঙ্গে ব্যক্তিবিশেষের অপরাধকে পুরো গোষ্ঠীর ওপর চাপানো কিংবা নির্দোষ ব্যক্তিকে হয়রানি করার প্রবণতা থেকেও বিরত থাকতে হবে।কওমি মাদরাসার ঐতিহ্য ও জনআস্থা রক্ষায় আত্মপক্ষ সমর্থনের ঊর্ধ্বে উঠে আত্মসংশোধন এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত উদ্যোগ কামনা করেছেন তিনি।তথ্যসূত্র: আহমাদুল্লাহর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত আহ্বান ও সংস্কার প্রস্তাব।