হৃদরোগের ঝুঁকি কেবল মধ্যবয়সে তৈরি হয়—এমন ধারণা প্রচলিত থাকলেও তরুণ বয়সেই ধমনিতে চর্বি ও কোলেস্টেরল জমে প্লাক তৈরি হতে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী পুরুষদের ৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং নারীদের ৬ দশমিক ৭ শতাংশের ধমনিতে প্লাকের উপস্থিতি রয়েছে। দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ ছাড়াই চলতে পারে এ প্রক্রিয়া। তাই অল্প বয়স থেকেই হৃদরোগের ঝুঁকির কারণ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত গবেষণাটিতে স্পেন ও ডেনমার্কের ১৮ থেকে ৭০ বছর বয়সী ১৬ হাজার ৮০৮ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের আগে থেকে শনাক্ত হৃদরোগ ছিল না। বিভিন্ন ধমনির বিস্তারিত ইমেজিং পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের শরীরে প্লাকের উপস্থিতি যাচাই করেন গবেষকরা।গবেষণার ফল অনুযায়ী, সব বয়স মিলিয়ে অংশগ্রহণকারীদের ৫৭ দশমিক ১ শতাংশের ধমনিতে প্লাক পাওয়া গেছে। তরুণদের ক্ষেত্রে হার তুলনামূলক কম হলেও তা উপেক্ষা করার মতো নয়। তবে ধমনিতে প্লাক পাওয়া মানেই ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাক হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।ধমনিতে কীভাবে তৈরি হয় প্লাকঅ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস হলো ধমনির দেয়ালে কোলেস্টেরল ও অন্যান্য উপাদান জমে আস্তরণ তৈরির একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। রক্তে এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলে তা ধমনির দেয়ালে জমতে পারে। পর্যায়ক্রমে প্রদাহজনিত কোষ, তন্তুযুক্ত টিস্যু ও ক্যালসিয়াম যুক্ত হয়ে প্লাক তৈরি হয়।এ প্রক্রিয়া বছরের পর বছর চললেও প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত স্পষ্ট উপসর্গ দেখা দেয় না। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে পারেন না। তবে প্লাক অস্থিতিশীল হয়ে ফেটে গেলে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। সেই জমাট রক্ত হৃদযন্ত্রের ধমনি বন্ধ করে দিলে হার্ট অ্যাটাক এবং মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে ইস্কেমিক স্ট্রোক হতে পারে।শৈশব থেকেই শুরু হতে পারে ঝুঁকিবিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিসের প্রাথমিক পরিবর্তন শৈশব ও কৈশোরেই শুরু হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে শিশুদের ধমনিতে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো বাধা সৃষ্টিকারী প্লাক তৈরি হয়ে যায়। বরং রোগের সূচনাপর্ব দীর্ঘদিন নীরবে চলতে পারে।ভারতের বেঙ্গালুরুর স্পর্শ হাসপাতালের প্রধান হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও মেডিকেল ডিরেক্টর ডা. রঞ্জন শেঠির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৈশোর থেকেই রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরল বেশি থাকলে দীর্ঘ সময় ধরে তা ধমনির ক্ষতি করতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করার অস্বাভাবিকতা, ধূমপান ও শরীরে অতিরিক্ত চর্বিও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।বংশগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অল্প বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে কিংবা বংশগত কারণে কোলেস্টেরল অত্যধিক বেড়ে গেলে ঝুঁকি বেশি হতে পারে।দক্ষিণ এশীয়দের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতাদক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে তুলনামূলক কম বয়সে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় আলোচনা হয়েছে। জিনগত বৈশিষ্ট্য, শরীরের গঠন, ইনসুলিন প্রতিরোধ, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং শৈশবের পরিবেশ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।এ অঞ্চলের অনেকের শরীরের ভরসূচক (বিএমআই) স্বাভাবিক থাকলেও পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমতে পারে। এটি ইনসুলিন প্রতিরোধ ও বিভিন্ন বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে বাইরে থেকে অতিরিক্ত মোটা মনে না হলেও শরীরে হৃদরোগের ঝুঁকির উপাদান থাকতে পারে।এ ছাড়া ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেশি, ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিএল কম এবং কিছু ক্ষেত্রে লিপোপ্রোটিন(এ)-এর মাত্রা বেশি থাকাও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।ভারতের কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে ১৬টি গবেষণায় ১৯ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারীর তথ্য পর্যালোচনা করে বিপাকীয় সিনড্রোমের হার প্রায় ৩ দশমিক ৪ থেকে ৫ শতাংশ পাওয়া গেছে। তবে গবেষণাভেদে রোগ নির্ণয়ের মানদণ্ড আলাদা হওয়ায় এ হারকে পুরো ভারতের জাতীয় চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ফাস্টফুড নয়, অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার, পরিশোধিত শর্করা, চিনিযুক্ত পানীয়, ঘন ঘন নাশতা এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।সবার কি ধমনির পরীক্ষা প্রয়োজন?গবেষণাটি সুস্থ কিশোর-কিশোরীদের সবার নিয়মিত ধমনির ইমেজিং পরীক্ষা করানোর সুপারিশ করে না। ধমনিতে প্লাক শনাক্ত হলেই ভবিষ্যতে হার্ট অ্যাটাক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার সবার ক্ষেত্রে এ ধরনের পরীক্ষা করালে হৃদরোগ প্রতিরোধে উপকার হবে—এমন প্রমাণও গবেষণাটি দেয়নি। কিছু উন্নত ইমেজিং পরীক্ষায় বাড়তি খরচ, অপ্রত্যাশিত ফলাফল এবং সিটি স্ক্যানের ক্ষেত্রে বিকিরণজনিত ঝুঁকি থাকতে পারে।ডা. রঞ্জন শেঠির মতে, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অল্প বয়সে হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস কিংবা বংশগত কোলেস্টেরলজনিত সমস্যার সন্দেহ থাকলে শিশু-কিশোরদের চিকিৎসকের পরামর্শে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।সামগ্রিকভাবে গবেষণার বার্তা হলো, হৃদরোগের ঝুঁকি শনাক্ত করার জন্য মধ্যবয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত নয়। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা পরীক্ষা করে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।