আকাশজুড়ে সাদা মেঘ। মেঘের ফাঁক গলে নরম রোদ এসে পড়েছে গ্রামের পথে। বাতাসে দুলছে মাঠভরা কাশফুল। উঠানের শিউলিগাছ থেকে ঝরে পড়ছে সাদা ফুল। প্রকৃতি সেজেছে শরতের চিরচেনা সাজে। তবু স্বপ্নের মনে নেই কোনো উৎসবের আনন্দ। চার বছর আগে হারানো বাবার স্মৃতি তাকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবের সেই দিনগুলোতে।জানালার পাশে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে উঠানের শিউলিগাছটির দিকে তাকিয়ে ছিল স্বপ্ন। অনেক দিন পর গ্রামে ফিরেছে সে। শহরের ব্যস্ততা, পড়াশোনা আর নানা দায়িত্বের ভিড়ে প্রকৃতির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গ্রামের মাটির গন্ধ, পাখির ডাক, পুকুরের পানি আর শরতের আকাশ তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে শৈশবের কাছে।শিউলিগাছের নিচ থেকে কয়েকটি ফুল কুড়িয়ে পুকুরপাড়ে গিয়ে বসতেই মনে পড়ে গেল বাবার কথা। চার বছর আগে এই শরৎকালেই হারিয়েছে বাবাকে। ঋতু বদলায়, প্রকৃতি ফিরে আসে পুরোনো সাজে, কিন্তু বাবার ফিরে আসা আর হয় না। স্মৃতির ভারে স্বপ্নের চোখের কোণে জমে ওঠে অশ্রু।কাশফুলের সঙ্গে জড়িয়ে বাবার স্মৃতিছোটবেলায় স্বপ্ন ছিল বাবার ভীষণ আদরের। প্রায় প্রতিদিন বিকালে বাবার হাত ধরে বাজারে যেত সে। এমনই এক বিকালে রাস্তার পাশে বিস্তীর্ণ কাশবন দেখে কৌতূহলী হয়ে বাবাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘বাবা, রাস্তার পাশে এই সাদা জিনিসগুলো কী? তুলা নাকি মেঘ?’হেসে বাবা বলেছিলেন, ‘না, এগুলো তুলা কিংবা মেঘ নয়। এগুলোকে কাশফুল বলে।’কথা শেষ হওয়ার আগেই বাবার হাত ছেড়ে কাশবনের দিকে ছুটে গিয়েছিল ছোট্ট স্বপ্ন। কখনো ডানে, কখনো বাঁয়ে দৌড়ে বেড়িয়েছে সাদা ফুলের ভেতর। দু-একটি কাশফুল তুলে বাবার কাছে ফিরে এসে একটি ফুল তাঁর হাতে দিয়ে বলেছিল, ‘বাবা, তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো বাবা। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’বাবা কিছুক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসেছিলেন। শরতের সেই বিকেলে বাবার মুখে ফুটে ওঠা হাসি আজও স্বপ্নের স্মৃতিতে অমলিন।ঋতু ফেরে, ফেরেন না বাবাসময় গড়িয়ে যায়। একসময় শরৎ শেষ হয়, মাঠ থেকে হারিয়ে যায় কাশফুল। পরেরবার মাঠে গিয়ে কাশফুল না দেখে ছোট্ট স্বপ্ন কেঁদে ফেলেছিল। মেয়ের কান্নায় বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন বাবা। তখনো স্বপ্ন জানত না, প্রকৃতির হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্য আবার ফিরে এলেও জীবনের কিছু শূন্যতা কখনো পূরণ হয় না।আজ স্বপ্ন বড় হয়েছে। শরৎ আসে, শরৎ চলে যায়। মাঠজুড়ে কাশফুল ফোটে, উঠানজুড়ে শিউলি ঝরে। কিন্তু বাবার হাত ধরে কাশবনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সেই দিনগুলো আর ফিরে আসে না।চার দিন হলো গ্রামে এসেছে স্বপ্ন। চারপাশের পরিচিত দৃশ্যগুলো আগের মতোই আছে। শুধু নেই সেই মানুষটি, যাঁর সঙ্গে এসব স্মৃতির প্রতিটি মুহূর্ত জড়িয়ে। প্রকৃতি তার নিয়মে সাজে, কিন্তু বাবাকে হারানোর বেদনা স্বপ্নের কাছে প্রতিবারই নতুন হয়ে ফিরে আসে।স্মৃতির কাছে ফিরে যাওয়াপুকুরপাড়ে বসে স্বপ্ন চোখ মুছে আকাশের দিকে তাকায়। সাদা মেঘ ভেসে যায় দূর আকাশে। হঠাৎ একটি শিউলি ফুল এসে পড়ে তার পাশে। ফুলটি হাতে তুলে নেয় সে। মুহূর্তের জন্য মনে হয়, বাবা যেন আগের মতোই পাশে আছেন—মাথায় হাত রেখে সাহস দিচ্ছেন, বলছেন, ‘ভয় পাস না, আমি তো আছি।’কিন্তু কল্পনার সেই আশ্রয় দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বাস্তবতা তাকে মনে করিয়ে দেয়, বাবা আর নেই। রয়ে গেছে শুধু তাঁর স্নেহ, হাসি আর অসংখ্য স্মৃতি।স্বপ্ন মুঠোয় শিউলি ফুলগুলো শক্ত করে ধরে মৃদু স্বরে বলে, ‘বাবা, শরৎ আবার এসেছে। শুধু তুমি আসোনি।’তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু। দূরের কাশবন বাতাসে দুলতে থাকে। উঠানে ঝরে পড়ে শিউলি ফুল। প্রকৃতির কাছে শরৎ কেবল আরেকটি ঋতুর আগমন; কিন্তু স্বপ্নের কাছে তা বাবাকে হারানোর বেদনা আর ভালোবাসার স্মৃতি ফিরে পাওয়ার নাম।