গাইবান্ধার অসহায় কৃষক তোফাজ্জল হোসেনের সারা জীবনের সঞ্চয় দুই লাখ টাকা উইপোকা ও ইঁদুরে নষ্ট করে দেওয়ার ঘটনায় তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশিরা। মানবিক সহায়তা হিসেবে তাঁকে আরও দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এতে জীবনের শেষ সম্বল হারিয়ে দিশাহারা ৭২ বছর বয়সী এই কৃষকের পরিবার কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে।শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ওয়াসা ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তোফাজ্জল হোসেনের হাতে সহায়তার অর্থ তুলে দেওয়া হয়। ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সালেহ উদ্দিন।অনুষ্ঠানে তোফাজ্জলের বড় মেয়ে মোসাম্মৎ মোর্শেদা ও গাইবান্ধার স্থানীয় সাংবাদিক ইদ্রিসউজ্জামান মোনা বক্তব্য দেন।সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথে কৃষকতোফাজ্জল হোসেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের ধুমাইটারি গ্রামের বাসিন্দা। স্ত্রী ফাতেমা বেগম ও তিন মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। অনেক কষ্টে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁর কোনো ছেলে নেই।একসময় জীবিকার তাগিদে ঢাকায় রিকশা চালাতেন তোফাজ্জল। বয়সের ভারে সেই কাজ করতে না পেরে গ্রামে ফিরে যান। এরপর কয়েক বছর ধরে অন্যের দুই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে স্ত্রীকে নিয়ে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছিলেন।অভাবের সংসারে ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা ভেবে জমিয়ে রেখেছিলেন দুই লাখ টাকা। কিন্তু আলমারিতে রাখা সেই সঞ্চয় উইপোকা ও ইঁদুরে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে। জীবনের শেষ সম্বল হারিয়ে টুকরো টাকার সামনে তাঁর আহাজারির দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশ-বিদেশের মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশিরা তাঁর পাশে দাঁড়ান।‘মানুষের বিপদে মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছে’অনুষ্ঠানে সালেহ উদ্দিন বলেন, তোফাজ্জল হোসেনের নষ্ট হয়ে যাওয়া দুই লাখ টাকা কেবল অর্থ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাঁর ঘাম, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা। একজন প্রান্তিক কৃষকের সারা জীবনের পরিশ্রমের সঞ্চয় এভাবে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনা গভীরভাবে বেদনাদায়ক।তিনি বলেন, এই মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে দেশ-বিদেশ থেকে যাঁরা যুক্ত হয়েছেন, তাঁদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা। মানুষের বিপদে মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছে—এটি সমাজের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। মানবিকতার এমন বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া সবার দায়িত্ব।সমাজে মানুষের স্বপ্ন ধ্বংস করতে চাওয়া নানা ধরনের ‘উইপোকা’ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব উইপোকাকে দমন করতে হবে।সভাপতির বক্তব্যে হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, মানবিকতার কোনো সীমারেখা নেই। এর কোনো ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নেই। মানবিকতার জন্য পাসপোর্ট বা ভিসার প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন শুধু মমত্ববোধ ও ভালোবাসা।তিনি বলেন, এই আয়োজন শুধু একজন প্রান্তিক কৃষককে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সহানুভূতি ও ভালোবাসারও অনন্য দৃষ্টান্ত। অসহায় কৃষকের সঞ্চিত অর্থ নষ্ট হওয়ার খবর পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশিরা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের প্রতি প্রবাসীদের ভালোবাসা ও দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটেছে।সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, অসহায়, দরিদ্র, কৃষক ও খেটে খাওয়া মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।তোফাজ্জল হোসেনের ঘটনা একদিকে প্রান্তিক মানুষের আর্থিক অনিশ্চয়তার চিত্র তুলে ধরেছে, অন্যদিকে বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।