মনপুরা ও চর কুকরি-মুকরির জীববৈচিত্র্য, অতিথি পাখি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সম্ভাবনাময় পর্যটনবঙ্গোপসাগরের উপকূলঘেঁষা দ্বীপজেলা ভোলা। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি, সবুজ বনাঞ্চল, নদীর বুকে জেগে ওঠা চর আর দিগন্তজোড়া আকাশ—সব মিলিয়ে জেলাটির উপকূলীয় প্রকৃতি অনন্য সৌন্দর্যের আধার। চর কুকরি-মুকরি, মনপুরা, তজুমদ্দিন ও চর নিজামের মতো এলাকাগুলো প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, বন্য প্রাণী ও নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার কারণে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার বিপুল সম্ভাবনা ধারণ করছে।দেশের বৃহত্তম দ্বীপ ভোলার চারপাশে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর প্রবাহ, অসংখ্য শাখা নদী এবং আঁকাবাঁকা খাল উপকূলীয় ভূপ্রকৃতিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। জোয়ার-ভাটার ছন্দ, নদীর ঢেউ, জেলেদের নৌকা আর বিস্তীর্ণ সবুজের সমাহার এ অঞ্চলের প্রকৃতিকে করেছে বৈচিত্র্যময়।সবুজ বন ও বন্য প্রাণীর আবাসভোলার উপকূলের অন্যতম আকর্ষণ চর কুকরি-মুকরি। সবুজ বন, নদী ও বালুচরের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ অঞ্চলে রয়েছে নানা প্রজাতির পাখি ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। বনের গাছপালা, কেওড়া-গেওয়ার মতো উপকূলীয় উদ্ভিদ এবং জোয়ার-ভাটায় বদলে যাওয়া প্রাকৃতিক পরিবেশ এখানকার জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে।শীত মৌসুমে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি উপকূলের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়। বালুচরে লাল কাঁকড়ার বিচরণ, গাছের শ্বাসমূল এবং বনের ভেতরকার প্রাকৃতিক পরিবেশও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে আকর্ষণীয়।উপকূলীয় বন শুধু সৌন্দর্যের উৎস নয়; প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাত কমানো, বন্য প্রাণীর আবাস রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এসব বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা জরুরি।মনপুরায় নদী, সবুজ মাঠ ও সূর্যাস্তভোলার আরেক আকর্ষণ মনপুরা দ্বীপ। মূল দ্বীপ থেকে দূরে অবস্থিত এ এলাকায় বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, নদীর চর, মহিষের পাল এবং গোধূলির মনোরম দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। নদীর বুকে নৌকার চলাচল ও জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য উপকূলীয় জীবনের পরিচিত চিত্র।তজুমদ্দিন ও চর নিজাম এলাকাতেও রয়েছে নদী ও উপকূলকেন্দ্রিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। নিরিবিলি পরিবেশ, জলরাশি আর সূর্যাস্তের দৃশ্য ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এসব স্থানকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।সৌন্দর্যের আড়ালে দুর্যোগের সঙ্গে লড়াইপ্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের পাশাপাশি ভোলার উপকূলীয় মানুষের জীবনজুড়ে রয়েছে নানা প্রতিকূলতা। নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি মোকাবিলা করেই তাঁদের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকা পরিচালিত হয়। মাছ ধরা, কৃষিকাজ ও নদীকেন্দ্রিক পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবনযাত্রা এ অঞ্চলের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।অতিথিপরায়ণতা, স্থানীয় খাবার, বিশেষ করে ইলিশ মাছ এবং সহজ-সরল জীবনধারা ভোলার উপকূলীয় জনপদের স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। প্রকৃতিনির্ভর এই জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিও পর্যটনের সম্ভাবনাকে সমৃদ্ধ করতে পারে।টেকসই পর্যটন ও সংরক্ষণে গুরুত্বভোলার উপকূলকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পরিকল্পিত যাতায়াতব্যবস্থা, পর্যটকদের নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং বন ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।পর্যটনের বিকাশ যেন উপকূলীয় পরিবেশের ক্ষতির কারণ না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে ভোলার পর্যটন সম্ভাবনা দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগানো সম্ভব।নদী, বন, চর ও সাগরের মিতালিতে ভোলার উপকূল বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যথাযথ সংরক্ষণ, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থার মাধ্যমে এ সৌন্দর্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ধরে রাখা সম্ভব।