জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, বন্যা ও বায়ুদূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্রমেই বড় হুমকি হয়ে উঠছে। এসব পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু, লেপ্টোস্পাইরোসিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি হিটস্ট্রোক, হৃদ্রোগ, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকেরা রয়েছেন বেশি ঝুঁকিতে।মালয়েশিয়ার জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় আবহাওয়া ও রোগের তথ্য সমন্বয় করে আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি, আগাম সতর্কতা এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।মশাবাহিত রোগ ও হিটস্ট্রোকের আশঙ্কাজনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী দাতুক ডা. জাইনাল আরিফিন ওমরের মতে, তাপমাত্রা বাড়লে এডিস মশার প্রজননচক্র দ্রুততর হতে পারে, যা ডেঙ্গুর বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে, অতিবৃষ্টি ও বন্যার সঙ্গে লেপ্টোস্পাইরোসিসের মতো রোগের বিস্তারের সম্পর্ক রয়েছে। জলবায়ুসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব ঝুঁকি আগেভাগে চিহ্নিত করা সম্ভব।তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকায় গরমের কারণে সৃষ্ট শারীরিক চাপ আরও তীব্র হতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও বাইরে কাজ করা শ্রমিকেরা হিটস্ট্রোকের বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। প্রচণ্ড গরমে হৃদ্রোগ ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাও বাড়তে পারে। এ ছাড়া ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ হাঁপানির উপসর্গ তীব্র করতে পারে।ডা. জাইনাল আরও বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে লার্ভা ধ্বংস ও থার্মাল ফগিংয়ের মতো কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা প্রয়োজন। কোনো এলাকায় রোগী শনাক্ত হওয়ার তিন দিনের মধ্যে এসব ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি একাধিক সংস্থার সমন্বয়ে দল গঠন, তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য শীতল আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনের পরামর্শ দেন। জাতীয় পর্যায়ে ‘হিট-হেলথ অ্যাকশন প্ল্যান’ প্রণয়নেরও আহ্বান জানান তিনি।বন্যার পর বাড়তে পারে নানা সংক্রমণমালয়েশিয়ার মেডিকেল প্র্যাকটিশনার্স কোয়ালিশন অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ডা. রাজ কুমার মহারাজা বলেন, ডেঙ্গু এখনো দেশটির জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগ। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত মশার বেঁচে থাকা, প্রজনন এবং ভাইরাস সংক্রমণের ওপর প্রভাব ফেলে।ডেঙ্গুর পাশাপাশি লেপ্টোস্পাইরোসিস, ডায়রিয়াজনিত রোগ, কলেরা, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস এ, তীব্র গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস ও খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি সম্পর্কেও মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।ডা. রাজের ভাষ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা ও দীর্ঘমেয়াদি চর্মরোগের উপসর্গ বাড়তে পারে। চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ মানুষের মধ্যে মানসিক চাপ ও উদ্বেগও তৈরি করতে পারে। তাই তাপজনিত অসুস্থতায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি রোগ নজরদারির সঙ্গে আবহাওয়া ও পরিবেশসংক্রান্ত তথ্য যুক্ত করা প্রয়োজন।সমন্বিত নজরদারি ও হাসপাতালের প্রস্তুতির তাগিদমালায়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. ভিক্টর হো আবহাওয়া, পরিবেশ, রোগের বিস্তার ও হাসপাতালসংক্রান্ত তথ্য একত্র করে সমন্বিত জলবায়ু-স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।তিনি জরুরি জনসতর্কতা পৌঁছে দিতে টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগানোর প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, ‘মাইসেজাতেরা’ অ্যাপকে ব্যক্তিগত জলবায়ু-স্বাস্থ্য সহায়ক হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। এর মাধ্যমে তাপপ্রবাহ, ধোঁয়াশা কিংবা বন্যার পানির সংস্পর্শে আসার পর ব্যবহারকারীরা উপসর্গ যাচাই করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে নির্দেশনা পেতে পারেন।ডা. হো বলেন, এ ধরনের ডিজিটাল ব্যবস্থা ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব, তাপজনিত অসুস্থতা ও বন্যার পর সংক্রমণের ঝুঁকি আগেভাগে অনুমান করতে সহায়তা করতে পারে। এতে রোগীর চাপ বাড়ার আগেই কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পাবে।তিনি আরও বলেন, হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বিকল্প বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। চরম আবহাওয়ার মধ্যেও চিকিৎসাসেবা সচল রাখতে ওষুধ ও টিকা সুরক্ষিত রাখতে হবে। বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আগেই শনাক্ত করে নিয়মিত চিকিৎসা ও খোঁজখবরের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।ঝুঁকিতে বাইরে কাজ করা শ্রমিকেরাডা. ভিক্টর হো বিশেষ করে গিগ অর্থনীতির কর্মীদের সুরক্ষা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। খাবার সরবরাহকারী কর্মী, মোটরসাইকেল চালক ও গাড়িচালকেরা তীব্র গরম, ভারী বৃষ্টি, বন্যা এবং খারাপ বায়ুমানের কারণে বাড়তি ঝুঁকিতে থাকেন।তিনি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আবহাওয়া ও বায়ুমানের তথ্য যুক্ত করার পরামর্শ দেন। এতে বিপজ্জনক এলাকায় কাজের দায়িত্ব কমানো, নিরাপদ পথের নির্দেশনা দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম ও পানি পানের বিরতি নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, নিয়োগকর্তা ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাসকে রোগ নজরদারি ও স্বাস্থ্যসেবার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর চাপ কমানো সহজ হবে।