পাহাড়ের বুক চিরে এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে পিচঢালা সীমান্ত সড়ক। দুই পাশে সবুজ পাহাড়ের সারি, ঢালে জুমঘর আর দূরে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের পাহাড়ি জনপদ। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যার মাঝিপাড়া সীমান্ত সড়ক প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য আকর্ষণ। সড়ক ধরে এগোতে এগোতে চোখে পড়ে পাহাড়ের বিচিত্র রূপ, আর পথের বাঁকে বাঁকে মেলে নতুন দৃশ্যের হাতছানি।সম্প্রতি ‘দে-ছুট’ ভ্রমণ সংঘের সদস্যদের সঙ্গে এই পথে ঘুরে প্রকৃতির এমনই রূপ কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে।মারিশ্যা থেকে পাহাড়ের পথেসারা রাতের যাত্রা শেষে সকাল ৭টার দিকে মারিশ্যা চৌমুহনী বাজারে পৌঁছান ভ্রমণদলের সদস্যরা। স্থানীয় সাংবাদিক ও পর্যটনবান্ধব ব্যক্তি ওমর ফারুক সুমনের সহযোগিতায় সরকারি মারিশ্যা বিশ্রামাগারে বিশ্রাম এবং মোটরসাইকেলের ব্যবস্থা হয়।স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও নানা সমস্যার কথা জানার সুযোগও হয়। ভ্রমণদলের ভাষায়, কোনো এলাকার প্রকৃত সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে হলে সেখানকার মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হওয়া জরুরি।তবে বাঘাইছড়িতে দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও গোলাগুলির খবর ভ্রমণদলকে সতর্ক করে দেয়। এ কারণে ভাড়ায় নেওয়া মোটরসাইকেলগুলো নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে পৌঁছায়। পরে সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা নিয়ে সকাল থেকে দুপুরের দিকে যাত্রা শুরু করেন তাঁরা।পাহাড়ের কোলে জুমঘর, মুড়ি-চানাচুরের আড্ডামাদরাসাপাড়া ও মধ্যম বাঘাইছড়ি পেরিয়ে জিরো পয়েন্টের দিকে এগিয়ে যায় দলটি। এরপর কচুছড়ি বিজিবি ক্যাম্পের কিছুটা পর ১৪ কিলোমিটার এলাকায় পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য দেখে থামতে হয়।চারদিকে উঁচু-নিচু পাহাড়, পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে চলে যাওয়া সড়ক আর ঢালে ছড়িয়ে থাকা জুমঘর—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন সাজিয়েছে নিজস্ব ক্যানভাস। প্রখর রোদ উপেক্ষা করে সড়ক থেকে নেমে পাহাড়ের ঢালে জুমঘরের বাঁশের মাচায় বসে সময় কাটান ভ্রমণকারীরা। সঙ্গে থাকা মুড়ি, চানাচুর, পেঁয়াজ ও মরিচ মিশিয়ে তৈরি হয় পথের খাবার। পাহাড়ি বাতাসে আড্ডা আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে কেটে যায় বেশ কিছুটা সময়।পরে চাকমা সম্প্রদায়ের ব্যবহৃত মাটির পাত্রে সংরক্ষিত ঠান্ডা পানি পান করে আবারও যাত্রা শুরু হয়। ১৭ কিলোমিটার এলাকায় পৌঁছে নতুন করে মুগ্ধ হন ভ্রমণকারীরা।মাঝিপাড়ায় মিজোরামের পাহাড়ের দৃশ্যযাত্রাপথের ২০ কিলোমিটার এলাকায় মাঝিপাড়া। এক পাশে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প, অন্য পাশে বিজিবির অবস্থান। সামনে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের পাহাড়সারি। দূরে মোজাম গ্রামের বাজারও দেখা যায় বলে জানান ভ্রমণলেখক।সীমান্তের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে এলাকাটি সংবেদনশীল হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। পাহাড়ের পর পাহাড়, সবুজের বিস্তার আর দূরের জনপদ—সব মিলিয়ে জায়গাটি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।ভ্রমণলেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের উচ্চতা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে সড়ক নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। সড়কটি সাজেকের উদয়পুর পর্যন্ত বিস্তৃত বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।জিকজ্যাক পয়েন্টে অন্য রকম রোমাঞ্চমাঝিপাড়া ঘুরে সাধারণত অনেকেই ফিরে যান। তবে ‘দে-ছুট’ দলের গন্তব্য ছিল আরও দূরে—বরকল উপজেলার বড় হরিণা। সে পথে স্থানীয়দের ভাষায় ‘জিকজ্যাক পয়েন্ট’ ভ্রমণদলের কাছে ছিল বিশেষ আকর্ষণ।পাহাড়ের উঁচু-নিচু ঢাল কেটে তৈরি আঁকাবাঁকা সড়কটি কখনো খাড়া ঢাল বেয়ে নিচে নেমেছে, আবার কখনো উঠে গেছে পাহাড়ের চূড়ার দিকে। ওপর থেকে তাকালে সর্পিল পথটিকে বিশাল সাপের মতো মনে হয়। মোটরসাইকেলে এই পথ পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতাকে ভ্রমণলেখক তুলনা করেছেন অ্যানিমেশন বা মোটরবাইক গেমের দৃশ্যের সঙ্গে।পাহাড়ের এমন ব্যতিক্রমী গঠন ও সড়কের নির্মাণশৈলী দেখতে দেখতে বড় হরিণা পৌঁছান তাঁরা। সেখানে পিচঢালা সড়ক শেষ হয়ে সামনে নির্মাণকাজ চলতে দেখা যায়। মোটরসাইকেল রেখে পাহাড়ে হাঁটেন ভ্রমণকারীরা। পাহাড়ের চূড়ায় স্থানীয় পাহাড়িদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সুখ-দুঃখের খোঁজ নেন। ফেরার পথে ২৭ কিলোমিটার এলাকায় এক চাকমা দোকানির তৈরি দুধ-চা পান করে ফিরতি যাত্রা শুরু হয়।কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেনঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি ও মারিশ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবহনের বাসে যাওয়া যায়। মারিশ্যা চৌমুহনী বাজার থেকে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে মাঝিপাড়া সীমান্ত সড়কে যাওয়া সম্ভব।থাকার জন্য খাগড়াছড়ি ও মারিশ্যায় বিভিন্ন মানের হোটেল, মোটেল এবং খাবারের রেস্তোরাঁ রয়েছে।ভ্রমণ সতর্কতা: মাঝিপাড়া সীমান্ত সড়ক একটি সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকা। ভ্রমণের আগে স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও প্রবেশের অনুমতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। নিরাপত্তা বাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলা এবং অনুমতি ছাড়া সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ না করাই জরুরি।