দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি—একটি রাষ্ট্রের সুশাসন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা। যে দেশে অনিয়ম, ঘুষ ও চাঁদাবাজির কারণে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হয়, সে দেশে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছানো কঠিন। তাই এখনই প্রয়োজন দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর, নিরপেক্ষ ও কার্যকর পদক্ষেপ।দুর্নীতি কেবল সরকারি অর্থ আত্মসাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেবা নিতে ঘুষ দেওয়া, নিয়োগ ও বদলিতে অনিয়ম, প্রকল্পের অর্থ অপচয়, সরকারি সম্পদ লুটপাট এবং ক্ষমতার অপব্যবহার—সবই দুর্নীতির বিভিন্ন রূপ। অন্যদিকে, চাঁদাবাজি মানুষের উপার্জন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে জিম্মি করে ফেলে। পরিবহন খাত, বাজার, ফুটপাত, নির্মাণকাজ কিংবা মহাসড়কে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পণ্য পরিবহন ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। শেষ পর্যন্ত এর বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ ভোক্তা, শ্রমজীবী মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। কোথাও অভিযোগ গ্রহণে গড়িমসি, কোথাও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, আবার কোথাও তদন্ত ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। তবে কোনো অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না; সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রভাব, পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান যেন আইনের প্রয়োগে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।**এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।** দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে।প্রথমত, দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।দ্বিতীয়ত, মহাসড়ক, পরিবহন টার্মিনাল, বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি বন্ধে নিয়মিত অভিযান এবং অভিযোগ যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। চাঁদা আদায়ের নামে ভয়ভীতি, হুমকি কিংবা জবরদস্তির অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। পরিবহন খাতে বৈধ ফি ও অবৈধ আদায়ের পার্থক্য স্পষ্ট করে দিতে হবে।তৃতীয়ত, সরকারি দপ্তরের সেবা, কেনাকাটা, উন্নয়ন প্রকল্প ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। সরকারি অর্থের ব্যয়, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং নিরীক্ষার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। এতে অনিয়ম শনাক্ত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা সহজ হবে।চতুর্থত, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তিদের নিরাপদে অভিযোগ জানানোর সুযোগ দিতে হবে। অভিযোগকারীর পরিচয় ও নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি অভিযোগের অগ্রগতি জানাতে হবে। গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, নাগরিক সমাজের নজরদারি এবং দায়িত্বশীল জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দিতে হবে।পঞ্চমত, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির পদ-পদবি, সামাজিক পরিচয় কিংবা প্রভাব বিবেচনা না করে আইনসম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগ, হয়রানি ও প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ড থেকে মানুষকে সুরক্ষা দিতে হবে, যাতে আইনের অপব্যবহার না হয়।মনে রাখতে হবে, শুধু অভিযান চালিয়ে কিংবা সাময়িক গ্রেপ্তার করে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন অপরাধের সুযোগ বন্ধ করা, আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, তদন্তের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে কার্যকর করা। অপরাধ করে কেউ যেন অবৈধ সুবিধা ভোগ করতে না পারে, আবার নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়—এটাই হতে হবে আইনের শাসনের মূলনীতি।রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা, অধিকার ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা জনআস্থা ক্ষুণ্ন করে এবং অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ায়। তাই দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হতে হবে ধারাবাহিক, প্রমাণনির্ভর এবং সবার ক্ষেত্রে সমান।**দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির টুঁটি চেপে ধরতে হবে আইনের কঠোর প্রয়োগ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নয়, অপরাধ ও অনিয়মকে লক্ষ্য করে।** এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। কারণ দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, চাঁদাবাজিমুক্ত জনজীবন এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার।দেশের দায়িত্বশীল নাগরিক মনে করেন , অপরাধীর পরিচয় নয়—অপরাধের প্রমাণই হোক ব্যবস্থা গ্রহণের ভিত্তি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেই দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গড়ার পথ সুগম হবে।মো: মোকাদ্দেস সরকার লেখক সাংবাদিক।