যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে সর্বজনীন ও বিনা মূল্যে শিশু পরিচর্যা কর্মসূচি সম্প্রসারণে কর বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন সিটি কাউন্সিলের স্পিকার জুলি মেনিন। তাঁর এ অবস্থান মেয়র জোহরান মামদানির গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগকে নতুন রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। আগামী বছর অঙ্গরাজ্যের বাজেট প্রণয়নের সময় শিশু পরিচর্যায় অর্থায়নের জন্য কর বাড়ানোর প্রস্তাব সমর্থন করবেন বলে জানিয়েছেন মেনিন।বুধবার পলিটিকোর আয়োজিত ‘নিউইয়র্ক আউটলুক: অ্যাফোর্ডেবিলিটি, ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড দ্য ইকোনমি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, শিশু পরিচর্যায় বাড়তি অর্থায়নের জন্য কর বৃদ্ধি শহরের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। এতে আরও কর্মী নিউইয়র্কে আসতে উৎসাহিত হবেন এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে।তবে কোন ধরনের কর কতটা বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব দেননি মেনিন। তাঁর মতে, মেয়র মামদানি, গভর্নর ক্যাথি হোকুল ও অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।বাজেট ঘাটতির চাপ, কর বাড়ানোর আলোচনাআগামী অর্থবছরে নিউইয়র্ক শহরের বাজেটে ৬০০ কোটি ডলারের বেশি ঘাটতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সর্বজনীন শিশু পরিচর্যা কর্মসূচির সম্প্রসারণের পাশাপাশি অন্যান্য সরকারি ব্যয় কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।মেনিন বলেন, চলতি বছরের বাজেট পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ওয়াল স্ট্রিট থেকে পাওয়া সাম্প্রতিক কিছু ইতিবাচক খবর শহরের অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক হতে পারে। তবে বিদ্যমান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ধরে রাখা এবং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করাও জরুরি।ধনী ব্যক্তি ও বড় করপোরেশনের ওপর কর বাড়ানোর বিষয়ে গভর্নর হোকুল এত দিন সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। মামদানি ও অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় তাঁর প্রগতিশীল মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কর বৃদ্ধির পক্ষে কথা বলে আসছেন। চলতি বছরের শুরুতে নিউইয়র্ক শহরের দামি দ্বিতীয় বাড়ির ওপর নতুন কর আরোপের প্রস্তাবে অবশ্য সমর্থন দিয়েছিলেন হোকুল।দুই বছর বয়সী শিশুদের জন্য নতুন কর্মসূচিমামদানির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম প্রধান অংশ সর্বজনীন শিশু পরিচর্যা। এর আওতায় শিশুদের বিনা মূল্যে পরিচর্যার সুযোগ ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করতে চান তিনি।চলতি বছরের শুরুতে গভর্নর হোকুল ও মেয়র মামদানি যৌথভাবে দুই বছর বয়সী শিশুদের জন্য নতুন কর্মসূচির প্রথম দুই বছরের অর্থায়ন পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এতে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই তাঁর অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে অগ্রগতি হয়। তবে পরবর্তী বছরগুলোর অর্থায়ন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।মামদানির লক্ষ্য, তাঁর প্রথম মেয়াদের শেষ নাগাদ নিউইয়র্ক শহরের সব দুই বছর বয়সী শিশুর জন্য এ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা। চলতি শরতে ইতিমধ্যে দুই বছর বয়সীদের জন্য দুই হাজার আসন চালু হয়েছে। ২০২৭ সালের শরৎ নাগাদ আরও ১০ হাজার আসন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।এর আগে মামদানি ছয় সপ্তাহ থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুর জন্য সর্বজনীন পরিচর্যা নিশ্চিত করতে বছরে ৬০০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে বলে হিসাব দিয়েছিলেন। তবে নিউ স্কুলের সেন্টার ফর নিউইয়র্ক সিটি অ্যাফেয়ার্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ ব্যয় বছরে ৯০০ কোটি ডলার হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।মেনিন আশা প্রকাশ করেন, ২০২৯ সালের মধ্যে সর্বজনীন শিশু পরিচর্যা কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। এ জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়নের পাশাপাশি শিশু পরিচর্যা সেবাদাতাদের মধ্যে বেতনবৈষম্য কমানোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।একই দাবিতে শহরের অন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিরাওনিউইয়র্ক শহরের নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মার্ক লেভিনও বুধবারের একই অনুষ্ঠানে আগামী বছর অঙ্গরাজ্য সরকারকে কর বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, বড় বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় কর বৃদ্ধির প্রস্তাব আলোচনার বাইরে রাখা উচিত নয়।শহরের পাবলিক অ্যাডভোকেট জুমানে উইলিয়ামসও আগামী বছর কর বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে শিশু পরিচর্যায় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে কর বৃদ্ধির প্রশ্নটি নিউইয়র্কের বাজেট আলোচনায় আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।তবে বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ে মামদানি ও মেনিনের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। স্বল্প বেতনের শিক্ষা সহায়ক কর্মীদের ১০ হাজার ডলারের বোনাস, নিম্ন আয়ের বাসিন্দাদের আবাসন ভাউচার সম্প্রসারণ এবং গৃহস্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের টানা ২৪ ঘণ্টার শিফট নিষিদ্ধ করার মতো বিষয়ে তাঁদের অবস্থান এক নয়। শিশু পরিচর্যার প্রশ্নে অবশ্য তাঁদের মধ্যে সমর্থনের জায়গা তৈরি হয়েছে।কর বৃদ্ধির বিরোধিতা ব্যবসায়ী মহলেরনিউইয়র্ক সিটির ব্যবসায়ী সংগঠন পার্টনারশিপ ফর নিউইয়র্ক সিটির প্রধান স্টিভেন ফুলপ ধনীদের ওপর কর বাড়ানোর নীতির সমালোচনা করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, ধনী ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হলে তারা নিউইয়র্ক থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে পারে। এতে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।অন্যদিকে, সিটিজেনস বাজেট কমিশনের প্রধান অ্যান্ড্রু রেইন মনে করেন, সরকারি অর্থে শিশু পরিচর্যার সুবিধা সবার জন্য উন্মুক্ত না করে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রয়েছে—এমন নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তাঁর মতে, কর্মসূচির পরিধি অতিরিক্ত বাড়ালে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।তবে মামদানির রাজনৈতিক ভিত্তি ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার নিউইয়র্ক শাখার সহসভাপতি গ্রেস মাউসার সর্বজনীন কর্মসূচির পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর মতে, বেশি মানুষ কোনো কর্মসূচির সুবিধা পেলে সেটির প্রতি জনসমর্থন বাড়ে এবং দীর্ঘ মেয়াদে কর্মসূচিটি টিকিয়ে রাখা সহজ হয়। এ ক্ষেত্রে তিনি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উদাহরণ দেন।শিশু পরিচর্যা কর্মসূচির অর্থায়ন নিয়ে এসব মতপার্থক্যের মধ্যেই আগামী বছরের অঙ্গরাজ্য বাজেট প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কর বাড়ানোর প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত কতটা এগোবে, তা নির্ভর করবে মেয়র মামদানি, গভর্নর হোকুল ও অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের আলোচনার ওপর।তথ্যসূত্র:পলিটিকোর ‘নিউইয়র্ক আউটলুক: অ্যাফোর্ডেবিলিটি, ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড দ্য ইকোনমি’ অনুষ্ঠানে জুলি মেনিনের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্ধৃতি ও প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য।