কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকা ঘিরে দেশের কয়েকটি জেলায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে ১৫টি ডিলারশিপের মধ্যে ১০টির দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি দিয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীরা। একই সঙ্গে লালমনিরহাট, ঝালকাঠি ও হবিগঞ্জেও ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা, অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের বঞ্চিত করা এবং অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।অভিযোগকারীদের দাবি, সার ডিলার নিয়োগে অভিজ্ঞতা, গুদাম, আর্থিক সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় লাইসেন্সের মতো বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিয়োগের প্রস্তাব উপজেলা পর্যায়ের কমিটির যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে কোথাও কোথাও তদন্তের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।নাগেশ্বরীতে ১০ ডিলারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গত ৭ অক্টোবর কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী পৌরসভা ও উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশ করা হয়। তালিকাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সচেতন মহলে সমালোচনা শুরু হয়।প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০টির পরিচালকদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। তালিকায় রায়গঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শফিকুল ইসলামের ‘মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্স’, সন্তোষপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ খলিলুর রহমানের ‘খালেদা ট্রেডার্স’, বামনডাঙ্গা ইউনিয়নে রওশন আলী খানের ‘রিদম এন্টারপ্রাইজ’, হাসনাবাদ ইউনিয়নে কৃষক লীগ নেতা আজাদ আলীর ‘কামাল ট্রেডার্স’ এবং কালীগঞ্জ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা দীপু চন্দ্র সরকারের ‘দীপালী ট্রেডার্স’-এর নাম রয়েছে। নারায়ণপুর ইউনিয়নে জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা ইয়াকুব আলীর ‘ইয়াকুব ট্রেডার্স’-এর নামও তালিকায় রয়েছে।নাগেশ্বরী পৌর কৃষক দলের সদস্যসচিব আদম আলী অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ডিলারদের সিন্ডিকেটের কারণে নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারীতে এ বছর সারের সংকট দেখা দিয়েছে। তাঁর দাবি, ১৫ জনের মধ্যে ১০ জনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম রসুল রাজা ও সদস্যসচিব মোখলেছুর রহমানের বিরুদ্ধেও অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রোকনুজ্জামান টুকু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারে এসে নিয়োগ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং প্রতিবাদ গড়ে তোলার কথা জানান।তবে উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব মোখলেছুর রহমান অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তাঁর ভাষ্য, নির্বাচিত ডিলারদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু ফাত্তাহ্ রওশন কবির বলেন, তালিকাটি উপজেলা কমিটির যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এসেছে। কারা কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, তা তাঁর জানা নেই।এদিকে ডিলারশিপ বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল শেষে বিএনপি নেতাকর্মীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন।লালমনিরহাটে যোগ্যতা ও নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্নলালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় সার ডিলার নিয়োগের তালিকায় চিহ্নিত মাদক কারবারি ও ক্যাসিনো-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত একজনের নাম রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তালিকাটি প্রকাশের পর স্থানীয় বাসিন্দা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি এলাকার জন্য তিনটি করে নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, তা তালিকায় সংকেতপূর্ণ চিহ্নের মাধ্যমে নির্দেশ করা হয়। তাঁর দাবি, তিনজন সংসদ সদস্যের দেওয়া তালিকা থেকেই সার ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে।অন্যদিকে, বাদ পড়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী অভিজ্ঞতা, গুদাম, আর্থিক সক্ষমতা ও লাইসেন্সকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা থাকলেও এবার তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। দীর্ঘদিন সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে ডিলারশিপ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব কৃষিবিদ সাইখুল আরেফিন বলেন, উপজেলা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর বাইরে তিনি বিস্তারিত জানেন না।ঝালকাঠিতে অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগঝালকাঠির ৩২টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দলীয় পরিচয় ও তদবিরের ভিত্তিতে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। জেলায় ৩৪ জন ডিলারের মধ্যে মাত্র সাতজনের আগে সার বিক্রির অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ডিলারদের সবাই নতুন এবং তাঁদের কারও পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই বলে দাবি করা হয়েছে। ঝালকাঠি পৌরসভায় ডিলারশিপ পাওয়া ইমরান হোসেন খান পৌরসভার ভোটার নন এবং ৫ আগস্টের পর বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শওকত হোসেন খোকন মল্লিক।নলছিটি, রাজাপুর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় ও পূর্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতারা। তবে সব নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত তদন্ত-সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলী আহমেদ বলেন, এ বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ডিলার নিয়োগ দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।হবিগঞ্জে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে অনুমোদনের অভিযোগহবিগঞ্জের ৭৮টি ইউনিয়ন ও ছয়টি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগেও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন ব্যক্তি এবং অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ডিলারশিপ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, নবীগঞ্জের কুর্শি ইউনিয়নে যুবলীগ নেতা আতাউর রহমান এবং ইনাতগঞ্জ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ নেতা আলী হুসেন ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাহুবলের পুটিজুরী ইউনিয়নের ডুবাঐ বাজারে ‘আলম ট্রেডিং সেন্টার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ীর দাবি, বাজারে ওই নামে কোনো দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই।মাধবপুরের জগদীশপুর ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া মোজাম্মেল হক আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী বলে অভিযোগ করেছেন এক ব্যবসায়ী। তাঁর নিয়োগ বাতিল চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।জেলা প্রশাসক ড. জিএম সরফরাজ বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ তাঁর দপ্তরে আসেনি। কেউ লিখিত অভিযোগ করলে বিষয়টি দেখা হবে।স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবিচার জেলায় সার ডিলার নিয়োগ ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোতে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা যাচাই এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং নিয়োগের মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।তথ্যসূত্র: ‘নাগেশ্বরীর ১৫ সার ডিলারের ১০ জনই আ.লীগ-জাপার’, প্রকাশিত ১৫ অক্টোবর ২০২৬। প্রতিবেদনে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, ঝালকাঠি ও হবিগঞ্জের স্থানীয় প্রতিনিধিদের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।