নতুন করে সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর উত্তরাঞ্চলের আট জেলায় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। নিয়োগে যোগ্যতা ও সরকারি বিধি অনুসরণ না করা, দলীয় প্রভাব খাটানো এবং অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে বাছাই কমিটির এক সদস্য নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।অভিযোগকারীদের দাবি, নতুন তালিকায় প্রকৃত ব্যবসায়ী ও কৃষকদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার না দিয়ে বিএনপি নেতাদের পরিবারের সদস্য এবং আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির স্থানীয় নেতাদের সমালোচনা করছেন দলটির ত্যাগী কর্মীদের অনেকে। জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে নিন্দা জানিয়েছেন।‘প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাদ দেওয়া হয়েছে’রংপুরের কাউনিয়ার ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন, মিঠাপুকুরের আহমদ আলী, পীরগঞ্জের মনসুর মিয়া ও বদরগঞ্জের সরোয়ার জাহান দৈনিক আমার দেশকে বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে স্বচ্ছ ও বিধিসম্মত নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রত্যাশা ছিল। তাঁদের অভিযোগ, যোগ্যতা ও কৃষকদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাই না করে দলীয় সুপারিশ এবং অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।তাঁদের আশঙ্কা, প্রকৃত ব্যবসায়ীদের পরিবর্তে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিরা ডিলারশিপ পেলে বরাদ্দের সার বেশি দামে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি হতে পারে। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরির ঝুঁকি বাড়বে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি বা প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগপীরগাছা উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জুয়েল অভিযোগ করেন, তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে সুবিধাভোগীদের ডিলার নিয়োগ দেওয়ায় দলে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। তাঁর দাবি, এ নিয়ে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সমালোচনা করছেন।বদরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা সাইদুল হক বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হওয়া নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে সুবিধাভোগীদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। এতে দলের তৃণমূল ক্ষুব্ধ হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।বদরগঞ্জের ১৩ নম্বর কালুপাড়া ইউনিয়নের প্রসঙ্গ টেনে সাইদুল হক অভিযোগ করেন, ওই ইউনিয়নে বিএনপির কয়েকজন ত্যাগী নেতাকর্মী ডিলারশিপের জন্য আবেদন করলেও আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত শহিদুল হক মানিকের মেয়ে অরিনের নামে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।ডিলারশিপের নামে টাকা লেনদেনের অভিযোগদিনাজপুরের পার্বতীপুরের জমশেদ আলী দাবি করেন, ডিলারশিপ পাওয়ার আশায় তিনি বিএনপির এক নেতাকে ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন, কিন্তু প্রকাশিত তালিকায় তাঁর নাম নেই।বদরগঞ্জের জাহাঙ্গীর আলমও একই ধরনের অভিযোগ করে বলেন, তাঁর সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল এবং তিনি ছয় লাখ টাকা দিয়েছেন। তিনজনের মধ্যে তাঁর নাম পাঠানো হলেও চূড়ান্ত তালিকায় নাম না থাকায় টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।তবে যাঁদের বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের নাম ও বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।জামায়াত-এনসিপির প্রতিনিধিত্ব না থাকার অভিযোগউপজেলা জামায়াতের আমির কামরুজ্জামান কবিরের অভিযোগ, প্রকাশিত তালিকায় বিএনপি নেতাদের পরিবারের সদস্য ও আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগীদের নাম থাকলেও জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের নাম নেই।রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় শূরা কমিটির সদস্য অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বেলালও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দলীয়করণ ও বিধি উপেক্ষার অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, তালিকায় দলীয় পরিচয় ও অর্থ লেনদেনের বিষয়টি প্রভাব ফেলেছে। তিনি এ প্রক্রিয়ার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।প্রশাসন ও বাছাই কমিটির বক্তব্যবদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সদ্য বদলি হওয়া আঞ্জুমান সুলতানা বলেন, সার ডিলার নিয়োগের তালিকা নিয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলামের কঠোর নির্দেশনা ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি নেতাকর্মীদের নাম অগ্রাধিকার দিতে এবং জামায়াত ও এনসিপির নেতাকর্মীদের নাম না রাখতে বলা হয়েছিল। এরপরও উপজেলা প্রশাসন তিনজনের নাম দিয়ে তালিকা জেলায় পাঠায় বলে তিনি জানান।এ বিষয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদ প্রশাসক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।রংপুরের জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পাঠানো তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সার ডিলার নিয়োগ সরকারের এখতিয়ারভুক্ত বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তালিকা কীভাবে চূড়ান্ত বা প্রকাশ করা হয়েছে, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কিছু করার নেই।অন্যদিকে, বাছাই কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক পরিতোষ চক্রবর্তী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, তালিকা প্রকাশে কোনো অনিয়ম হয়নি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনাকারীরা বিষয়টি না বুঝেই এমন বক্তব্য দিচ্ছেন। তবে তালিকায় শুধু বিএনপির লোকজনের নাম রয়েছে কি না এবং জামায়াত-এনসিপির কাউকে বাদ দেওয়া হয়েছে কি না—এ প্রশ্নে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।তথ্যসূত্র: দৈনিক আমার দেশ, বাদশাহ ওসমানী, রংপুর; প্রকাশিত ১১ অক্টোবর ২০২৬। প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি পুনর্লিখিত।