মহাকাশকে সামরিক প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্রে পরিণত করা হলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান। মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেছেন, কক্ষপথে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে।তুরস্কের আনতালিয়ায় আন্তর্জাতিক মহাকাশচারী সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।কক্ষপথে মার্কিন অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগএরদোয়ানের এ বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যে তাদের কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েনের সক্ষমতা রয়েছে। গত মাসে মার্কিন বিমানবাহিনীর সেক্রেটারি ট্রয় মেইঙ্ক জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কক্ষপথে অবস্থানকারী ‘স্পেস কন্ট্রোল উইপন’ রয়েছে, যা শত্রুপক্ষের হামলা থেকে মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষায় ব্যবহার করা যেতে পারে।তবে এসব অস্ত্রের ধরন, সক্ষমতা কিংবা সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।যুক্তরাষ্ট্রের এই স্বীকৃতির পর মহাকাশের ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে রাশিয়া ও চীনও মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েন মহাকাশের স্থিতিশীলতা এবং পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।স্যাটেলাইট ধ্বংসের প্রযুক্তিও ঝুঁকিরমহাকাশে সামরিক সক্ষমতা এখন শুধু প্রচলিত অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইট অচল করার প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক জ্যামিং, লেজার, সাইবার হামলা এবং অন্য স্যাটেলাইট ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস করার সক্ষমতাও এর অংশ। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনসহ কয়েকটি দেশ এসব প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক সামরিক ও বেসামরিক ব্যবস্থার বড় একটি অংশই এখন স্যাটেলাইটনির্ভর। জিপিএস, যোগাযোগ, নেভিগেশন, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণে কক্ষপথের স্যাটেলাইটের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। ফলে মহাকাশে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে এর প্রভাব শুধু সামরিক খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বেসামরিক যোগাযোগব্যবস্থা থেকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।স্যাটেলাইট ধ্বংস হলে বাড়বে ধ্বংসাবশেষের ঝুঁকিমহাকাশে অস্ত্র ব্যবহারের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো কক্ষপথে ছড়িয়ে পড়া ধ্বংসাবশেষ। কোনো স্যাটেলাইট ধ্বংস হলে তার অসংখ্য টুকরো অত্যন্ত উচ্চগতিতে কক্ষপথে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে অন্যান্য স্যাটেলাইট ও মহাকাশযানের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে মহাকাশে নিরাপদে কার্যক্রম পরিচালনাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।প্রচলিত অস্ত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে ফাঁক১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটি মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্রসহ অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র স্থাপন নিষিদ্ধ করেছে। তবে প্রচলিত অস্ত্র কক্ষপথে মোতায়েনের বিষয়ে চুক্তিটিতে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই। এ কারণে মহাকাশে প্রচলিত অস্ত্র মোতায়েন ঠেকাতে আন্তর্জাতিক আইন ও নতুন বিধিব্যবস্থা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে।এরদোয়ানের সতর্কবার্তার মধ্য দিয়ে তুরস্কও মহাকাশের ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকারী দেশগুলোর কাতারে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েনের স্বীকৃতির পর মহাকাশকে ঘিরে সামরিক প্রতিযোগিতা কতটা বিস্তৃত হয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ।তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, রয়টার্স, এপি নিউজ ও এবিসি নিউজ।