গাজীপুর ফেরার পথে চার প্রজন্মের যাত্রা থামল আকুয়া বাইপাসেময়মনসিংহে দ্রুতগতির বাসের চাপায় একই পরিবারের চারজনসহ সাতজন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার ময়মনসিংহ-জামালপুর আঞ্চলিক সড়কের আকুয়া বাইপাস মোড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন জামালপুর সদর উপজেলার দড়ি হামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের মোফাজ্জল হোসেন লেবু (৫৫), তাঁর মা রশিদা বেগম (৮৫), মেয়ে মর্জিনা বেগম (২৫) ও পাঁচ বছরের নাতি মিলান। একই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন মমতা বেগম (৩৯) ও তাঁর স্বামী আকরাম হোসেনসহ আরও তিনজন।স্বজনদের ভাষ্য, কেউ ফিরছিলেন কর্মস্থলে, কেউ যাচ্ছিলেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গাজীপুরের ভাড়া বাসায়। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই একটি বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় থেমে যায় তাঁদের জীবনযাত্রা।গাজীপুর ফেরা হলো না চারজনেরমোফাজ্জল হোসেন লেবু দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের হোতাপাড়ায় নির্মাণশ্রমিকের কাজ করতেন। বৃহস্পতিবার তিনি গ্রামের বাড়িতে আসেন। পরদিন শুক্রবার মা রশিদা, মেয়ে মর্জিনা ও পাঁচ বছরের নাতি মিলানকে সঙ্গে নিয়ে গাজীপুরের ভাড়া বাসায় ফেরার উদ্দেশে বের হন।সকালে দড়ি হামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের বাড়ি থেকে তাঁরা নান্দিনা বাজারে যান। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ময়মনসিংহ-ঢাকা বাইপাসের দিকে রওনা হন। পরিকল্পনা ছিল, বাইপাস থেকে বাসে করে গাজীপুর যাবেন।আকুয়া বাইপাস মোড়ে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগতির রাজিব পরিবহনের একটি বাস অটোরিকশাটিকে চাপা দেয়। ঘটনাস্থলেই মারা যান মোফাজ্জল, তাঁর মা রশিদা, মেয়ে মর্জিনা ও নাতি মিলান। স্বজনরা জানিয়েছেন, মর্জিনা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।মোফাজ্জালের ছোট ভাই মোবারক হোসেন বলেন, মা, ভাতিজি ও নাতিকে নিয়ে গাজীপুরে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর ভাইয়ের। সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে থাকার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু কেউ আর গাজীপুরে পৌঁছতে পারেননি।মায়ের কাছ থেকে নেওয়া ২ হাজার টাকাই শেষ স্মৃতিএকই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান মমতা বেগম ও তাঁর স্বামী আকরাম হোসেন। শুক্রবার সকালে মায়ের কাছ থেকে ২ হাজার টাকা নিয়ে কর্মস্থল ভালুকায় যাওয়ার উদ্দেশে বেরিয়েছিলেন মমতা। তিনি ভালুকার একটি গার্মেন্টসে কাজ করতেন। এক মাস আগে চাকরি ছেড়ে বাড়িতে এসেছিলেন; নতুন করে কাজে যোগ দেওয়ার কথা ছিল তাঁর।স্বামী আকরাম হোসেন ছিলেন নির্মাণশ্রমিক। দুই মেয়েকে নিয়ে তাঁদের সংসার চলত দুজনের আয়ে। শরিফপুর বাজার থেকে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ময়মনসিংহের দিকে যাচ্ছিলেন মমতা। সেখান থেকে বাসে করে ভালুকায় যাওয়ার কথা ছিল তাঁদের।আকুয়া বাইপাসে রাজিব পরিবহনের বাসটি অটোরিকশাটিকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই মারা যান মমতা ও আকরাম।মমতার মা রশিদা বেগম বলেন, কাজে যাওয়ার জন্য মমতা তাঁর কাছ থেকে ২ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। পথে টাকা হারিয়ে ফেলায় তিনি মেয়েকে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু মমতা কথা শোনেননি। কয়েক ঘণ্টা পর সেই মেয়েকেই লাশ হয়ে বাড়িতে ফিরতে হয়েছে।মমতার ভাতিজা সাজ্জাদ হোসেন পাপন জানান, তাঁর চাচি গার্মেন্টসে এবং চাচা নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। দুজনের আয়েই সংসার চলত। নতুন করে কাজে ফেরার পথেই দুর্ঘটনায় তাঁদের মৃত্যু হয়।দুই শিশুর সামনে বাবা-মা হারানোর শূন্যতামমতা ও আকরামের দুই কন্যাসন্তান রয়েছে। সংসারে কিছুটা স্বস্তি ফেরাতে কাজে ফিরছিলেন মমতা। হাতে ছিল মায়ের কাছ থেকে নেওয়া ২ হাজার টাকা। কিন্তু সেই সামান্য অর্থের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পরিবারের স্বপ্নও সড়কেই থেমে গেল।একইভাবে মোফাজ্জাল, তাঁর মা, মেয়ে ও নাতির মৃত্যুতে একটি পরিবারের চার প্রজন্মের বন্ধন একসঙ্গে ছিন্ন হয়েছে। দুর্ঘটনায় স্বজনহারা পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে গভীর শোক।নিজ নিজ গ্রামে দাফনশুক্রবার রাতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে নিহতদের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে জামালপুর সদর উপজেলার রানাগাছা ও শরিফপুর ইউনিয়নের নিজ নিজ গ্রামে নেওয়া হয়।মোফাজ্জাল হোসেন লেবু ও তাঁর মা রশিদা বেগমের জানাজা নিজ বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হয়। মর্জিনা ও তাঁর ছেলে মিলানের জানাজা হয় রানাগাছা ইউনিয়নের ঘোড়ার কান্দা গ্রামে মর্জিনার শ্বশুরবাড়িতে। পরে তাঁদেরও পাশাপাশি দাফন করা হয়।অন্যদিকে শরিফপুর ইউনিয়নের বাদেচাঁন্দি গ্রামের বাসিন্দা আকরাম হোসেন ও তাঁর স্ত্রী মমতার লাশ শুক্রবার রাতে বাড়িতে পৌঁছায়। জানাজা শেষে বাদেচাঁন্দি সামাজিক কবরস্থানে তাঁদের পাশাপাশি দাফন করা হয়।