দেশের শহরাঞ্চলে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানকে নিষিদ্ধ না করে নিবন্ধন, লাইসেন্সিং, নির্দিষ্ট রুট ও নিরাপত্তা মানদণ্ডের আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন পরিকল্পনাবিদ ও উন্নয়ন নীতি বিশ্লেষক তৌফিক মহিউদ্দীন। তাঁর মতে, এসব যান লাখো মানুষের প্রথম ও শেষ মাইলের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ফলে এগুলো বন্ধের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত কাঠামোয় এনে টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।স্টার নিউজে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে তিনি বলেন, দেশের শহরাঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান চলাচল করছে। ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ২১ শতাংশের জন্য এসব যান দায়ী ছিল বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ১ হাজার ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা করেছে।লেখকের মতে, ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান নিষিদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ এসব যানকে ঘিরে বিপুল মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে এবং শহরের পরিবহন ব্যবস্থায় প্রথম ও শেষ মাইলের সংযোগে এগুলোর ভূমিকা রয়েছে।নিবন্ধে বলা হয়েছে, প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ খাতে বিনিয়োগ করেছেন। তাই নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুণগত মানদণ্ড, নির্দিষ্ট গতিসীমা, নিবন্ধন ও লাইসেন্সিংয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।বুয়েটের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আসিফ-উজ-জামান খানের প্রস্তাবের বরাত দিয়ে নিবন্ধে বলা হয়, এসব যানকে প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে মেট্রোরেল ও বাস স্টেশনের আশপাশে ফিডার সার্ভিস হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে গণপরিবহনের প্রথম ও শেষ মাইলের সংযোগ আরও কার্যকর হবে।নিবন্ধন ও বাস্তবায়নে ঘাটতিনিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘থ্রি-হুইলড লো-স্পিড ব্যাটারি-অপারেটেড রিকশা (ই-রিকশা) ইন সিটি কর্পোরেশন এরিয়া রুলস, ২০২৫’ জারি করেছে। তবে এর বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সাম্প্রতিক তথ্যের বরাত দিয়ে নিবন্ধে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান চলাচল করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত বৈদ্যুতিক যানের সংখ্যা মাত্র ৬৬৯। বিপুলসংখ্যক যান ও নিবন্ধিত যানের এই ব্যবধানকে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার প্রতিফলন হিসেবে দেখেছেন লেখক।ব্যাটারি বর্জ্য নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগের অন্যতম কারণ সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি। নিবন্ধে বলা হয়েছে, দেশের মোট সীসা ব্যাটারি বাজারের ৭৮ শতাংশ এসব যান ব্যবহার করছে।সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণার বরাত দিয়ে আরও বলা হয়েছে, প্রায় ৮০ শতাংশ সীসা ব্যাটারি অবৈধভাবে পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে শিশুদের সীসা বিষক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের মতে, ব্যাটারিচালিত যান বায়ুদূষণ কিছুটা কমালেও ব্যাটারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যথাযথ না হলে পরিবেশগত সুফল সীমিত থাকবে।পাঁচ দফা নীতির প্রস্তাবব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানকে নিয়ন্ত্রিত কাঠামোয় আনতে নিবন্ধে পাঁচটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।প্রথমত, বিআরটিএর অধীনে এসব যানের জন্য পৃথক শ্রেণি চালু করে কাঠামোগত মানদণ্ড, কার্যকর ব্রেকিং ব্যবস্থা ও ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার গতিসীমা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।দ্বিতীয়ত, সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি থেকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে পর্যায়ক্রমে রূপান্তরের সময়সীমা নির্ধারণ এবং ব্যাটারি উৎপাদক ও আমদানিকারকদের ওপর সম্প্রসারিত উৎপাদক দায়িত্ব বা ইপিআর নীতি চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।তৃতীয়ত, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করে এসব যানকে মেট্রোরেল ও বাস স্টেশনের সঙ্গে সংযোগকারী ফিডার সার্ভিস হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধান সড়ক এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে।চতুর্থত, ব্যাটারি চার্জিং স্টেশন স্থাপনে বিশেষ ইউটিলিটি সার্ভিস চার্জ চালু এবং বর্তমানে অনুমোদিত ৩২টি চার্জিং স্টেশনের সংখ্যা বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি জেলায় অন্তত দুটি করার প্রস্তাব রয়েছে।পঞ্চমত, চালকদের নিরাপদ ড্রাইভিং, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা ও জরুরি সেবা বিষয়ে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।লেখকের মতে, দেশে ১ হাজার ৪০০ বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনার পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানকে পরিবহন পরিকল্পনার অংশ করা জরুরি। তাঁর যুক্তি, প্রথম ও শেষ মাইলের সংযোগ কার্যকর না হলে বাস ও মেট্রোরেলভিত্তিক বড় গণপরিবহন পরিকল্পনাও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কার্যকর করা কঠিন হবে।নিবন্ধে তাই ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানকে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে নিয়ন্ত্রণ, বৈধতা ও নিরাপত্তার আওতায় এনে টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।