ওজন কমানোর লক্ষ্য থেকে শুরু হওয়া খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন কখনো কখনো গুরুতর মানসিক সমস্যায় রূপ নিতে পারে। ‘ইটিং ডিজঅর্ডার’ বা খাদ্যাভ্যাসজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই একাকীত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগেন। এতে সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে নিজের কথা বলা কিংবা প্রয়োজনীয় সহায়তা চাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।যুক্তরাজ্যের দ্বীপ অঞ্চল জার্সির ৩০ বছর বয়সি অ্যানা বেনেটের অভিজ্ঞতায় বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২০ সালে স্বাভাবিকভাবে ওজন কমানোর চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি ‘বিঞ্জ ইটিং’ বা নিয়ন্ত্রণহীন অতিরিক্ত খাওয়ার সমস্যায় আক্রান্ত হন। পরে স্থানীয় সহায়তা সংস্থা ‘জার্সি ইটিং ডিজঅর্ডারস সাপোর্ট’-এর সহায়তা নেন। দীর্ঘদিন চিকিৎসা ও পরামর্শ পাওয়ার পর সম্প্রতি তাকে সংস্থাটির প্রথম আনুষ্ঠানিক ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করা হয়েছে।অ্যানা জানান, শুরুতে তিনি বিষয়টিকে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবেই দেখেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে খাবারের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি জটিল হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে তা গুরুতর বিঞ্জ ইটিং সমস্যায় পরিণত হয়।ইটিং ডিজঅর্ডার সম্পর্কে আগে তার ধারণাও ছিল সীমিত। অতিরিক্ত কম খাওয়া বা জোর করে বমি করার মতো উপসর্গকেই তিনি এ ধরনের সমস্যার প্রধান লক্ষণ মনে করতেন। পরে এক বন্ধুর উৎসাহে তিনি সহায়তা সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ক্যারেন ডিঙ্গেলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।অ্যানার ভাষ্য, প্রথমবার অপরিচিত মানুষের সাপোর্ট গ্রুপে যেতে তিনি ভয় পেয়েছিলেন। মনে হয়েছিল, সেখানে সবাই তাকে বিচার করবে। কিন্তু গ্রুপে যাওয়ার পর সেই ধারণা বদলে যায়। বরং তিনি সেখানে নিজের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ খুঁজে পান।সুস্থতার পথে পারিবারিক ট্র্যাজেডিসুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় অ্যানাকে বড় ধরনের পারিবারিক আঘাতও সামলাতে হয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে ক্যানসারে তার মা মারা যান। এর মাত্র চার মাস পর ডিসেম্বরে রক্তের গুরুতর সংক্রমণে তার বাবারও মৃত্যু হয়।অ্যানার মতে, এ ধরনের বড় জীবনঘটনা মানসিকভাবে সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। দীর্ঘদিন ভালো থাকার পরও কোনো বড় সংকটে মানুষ পুরোনো নেতিবাচক অভ্যাসে ফিরে যেতে পারেন।এখন অ্যাম্বাসেডর হিসেবে তিনি ইটিং ডিজঅর্ডার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন। তার মতে, কোথায় সহায়তা পাওয়া যায়—এ তথ্য অনেকেরই জানা থাকে না। তাই আক্রান্ত ব্যক্তিদের মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি যে তারা একা নন এবং প্রয়োজনের সময় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।যে কারও হতে পারে ইটিং ডিজঅর্ডারইটিং ডিজঅর্ডার নিয়ে সমাজে প্রচলিত একটি ধারণা হলো—এটি নির্দিষ্ট বয়স, শারীরিক গঠন বা শ্রেণি-পেশার মানুষের সমস্যা। অ্যানা এই ধারণাকে ভুল বলে উল্লেখ করেছেন।তার মতে, যেকোনো বয়স ও শারীরিক গঠনের মানুষের মধ্যে এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবার আক্রান্ত ব্যক্তির আচরণ বা চেহারা দেখে সবসময় সমস্যাটি বোঝাও সম্ভব নয়। কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার পর বিষয়টি প্রকাশ করতে পারেন, আবার কেউ স্বাভাবিক জীবনযাপনের আড়ালে দীর্ঘদিন সমস্যার সঙ্গে লড়াই করতে পারেন।এই ভুল ধারণা দূর করা গেলে আক্রান্ত ব্যক্তিদের একাকীত্ব কমবে এবং প্রয়োজনের সময় সাহায্য চাওয়াও সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।গুরুতর হওয়ার আগেই সহায়তা নেওয়ার পরামর্শঅ্যানার পরামর্শ, খাবারের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক তৈরি হলে সমস্যা গুরুতর হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।প্রথমবার সাহায্য চাওয়া কঠিন মনে হলেও এটি দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং সুস্থতার পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনের সময় সহায়তা চাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী পদক্ষেপ।