জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, মার্কেট ও অন্যান্য সম্পদ জব্দ এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ থাকলেও যশোর-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রণজিত কুমার রায়ের সম্পদ থেকে আয় বন্ধ হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, এসব সম্পদ থেকে আদায় করা অর্থের একটি বড় অংশ ব্যাংকে জমা না দিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাঠানো হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর রণজিত কুমার রায় ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ভারতে অবস্থান করছেন বলে স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে। এদিকে যশোরের বিভিন্ন এলাকায় থাকা তাঁদের বাড়ি, ফ্ল্যাট, মার্কেট, দোকান ও মাছের ঘের থেকে নিয়মিত আয় হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।ব্যাংকের ভাড়া জমা হচ্ছে অবরুদ্ধ হিসাবেসরেজমিনে বাঘারপাড়ার খাজুরা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, এক বিঘা জমির ওপর রণজিত রায়ের চারতলা একটি ভবন রয়েছে। ভবনটির নিচতলায় কৃষি ব্যাংক, দ্বিতীয় তলায় সোনালী ব্যাংক, তৃতীয় তলায় কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং চতুর্থ তলায় একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ফ্ল্যাট রয়েছে। নিচতলার মার্কেটে কয়েকটি জুয়েলারি দোকানও রয়েছে।সোনালী ব্যাংকের খাজুরা শাখার ব্যবস্থাপক মোতাছিম বিল্লাহ বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার কারণে ২০২৫ সাল থেকে ব্যাংকের ভাড়ার টাকা রণজিত রায়ের অবরুদ্ধ হিসাবে জমা দেওয়া হচ্ছে। একই তথ্য জানিয়েছেন কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপক পলাশ ঘোষ।তবে ওই মার্কেটের কয়েকজন জুয়েলারি ব্যবসায়ী জানান, মামলার পর থেকে তাঁরা ভাড়া দেওয়া বন্ধ রেখেছেন।শহরের দুই ভবন থেকে মাসে ৯৪ হাজার টাকা ভাড়াযশোর শহরের রেল রোডে রণজিত রায়ের একটি তিনতলা ও একটি পাঁচতলা ভবন রয়েছে। ভবন দুটির নিচে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ওপরের তলায় আবাসিক ফ্ল্যাট রয়েছে। পাঁচতলা ভবনের চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় রণজিত রায় সপরিবারে থাকতেন।দুর্গাপদ নামে এক ব্যক্তি জানান, ভবন দুটি থেকে তিনি মাসে ৯৪ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করেন। তাঁর দাবি, আদায় করা ভাড়া যথাস্থানে পাঠানো হয়। তবে কত টাকা কীভাবে এবং কার কাছে পাঠানো হয়, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।বড় বাজারের লোহাপট্টি রোডে রণজিতের একটি দ্বিতল ভবন রয়েছে। সেখানে মার্কেট ও আবাসিক ফ্ল্যাট রয়েছে। স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর ভাষ্য, প্রতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে মইদুল নামে একজন এসে ভাড়া সংগ্রহ করেন। তবে মইদুলের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।খাজুরা বাজারে দুই বিঘার বেশি জমিতে রণজিতের একটি নির্মাণাধীন মার্কেটও রয়েছে। সেখানে কয়েকটি দোকান ও একটি হোটেল আছে। হোটেলটির ব্যবস্থাপক রাশেদ মোড়ল বলেন, দোকানের ভাড়া কাকে দেওয়া হয়, তা তাঁর জানা নেই।জমি, পেয়ারা বাগান ও মাছের ঘেরসাদিপুর গ্রামের জোড়াপুল বিলে রণজিত রায়ের প্রায় ২৩ বিঘা জমি রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এর পূর্ব পাশে আরও ৮ থেকে ৯ বিঘা চাষের জমি রয়েছে।এ ছাড়া যশোরের চৌগাছায় কপোতাক্ষ নদের তীরে প্রায় ৪৫ বিঘা জমিতে পেয়ারা বাগান এবং কয়েকশ বিঘা জমিতে মাছের ঘের রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভয়নগরের নওয়াপাড়া বাজারে সড়কের পাশে তাঁর ১০ শতক জমি রয়েছে, যার মূল্য ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা বলে স্থানীয়দের দাবি।যশোর ও খাজুরার কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, এসব সম্পদ দেখভালের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি মাস শেষে আয় সংগ্রহ করে হুন্ডির মাধ্যমে রণজিত রায়ের কাছে পাঠাচ্ছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।১৩৭ ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ, জব্দ ৭৯.৬২ বিঘা জমিরণজিত কুমার রায় দীর্ঘদিন বাঘারপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি যশোর-৪ আসন থেকে তিন মেয়াদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তাঁর হলফনামায় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং তাঁর স্ত্রী নিয়তি রানী রায়ের নগদ ৭০ হাজার টাকা ও ১৫ হাজার টাকা মূল্যের ৫ তোলা স্বর্ণ থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এমপি হওয়ার পর তিনি অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে।এর পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের মার্চে ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত রণজিত রায়, তাঁর স্ত্রী নিয়তি রানী রায় এবং দুই ছেলে রাজীব ও সজিবের চারটি ফ্ল্যাট, দুটি বাড়ি, ৬০টি দোকানসহ ৭৯ দশমিক ৬২ বিঘা জমি জব্দ এবং ১৩৭টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেন।রিসিভার নিয়োগ না হলে সম্পদ থেকে আয় বন্ধের সুযোগ নেইযশোর জেলা দুদকের উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, মামলাটি দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে পরিচালিত হওয়ায় এ বিষয়ে তাঁদের কাছে হালনাগাদ তথ্য নেই।তিনি জানান, সাধারণত এ ধরনের মামলায় আসামির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সংযুক্ত থাকে। আদালতের মাধ্যমে রিসিভার নিয়োগ করা হলে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি থেকে অর্জিত আয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়।তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬; স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য।