মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে ড্রোন ও সম্ভাব্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় উচ্চক্ষমতার লেজার অস্ত্র ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। চমকপ্রদ বিষয় হলো, এসব অস্ত্র পরিচালনায় সামরিক বাহিনী পুনর্গঠিত ভিডিও গেম কনসোলের কন্ট্রোলার ব্যবহার করছে, যা এক্সবক্সের কন্ট্রোলারের আদলে তৈরি। নিউইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের লেজার প্রযুক্তি এখন গবেষণাগার ও পরীক্ষামূলক পর্যায় পেরিয়ে বাস্তব সামরিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর পাশাপাশি দেশটির দক্ষিণ সীমান্তেও ড্রোন মোকাবিলায় প্রযুক্তিটির ব্যবহার ও পরীক্ষা চালানো হয়েছে।কম খরচে ড্রোন প্রতিরোধপ্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রতিটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে আলাদা ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন হয়। লেজার অস্ত্রের ক্ষেত্রে তা প্রয়োজন নেই। জেনারেটর বা ব্যাটারি থেকে পাওয়া বিদ্যুৎকে উচ্চক্ষমতার আলোকরশ্মিতে রূপান্তর করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর ওপর কেন্দ্রীভূত করা হয়। দীর্ঘ কয়েক সেকেন্ড রশ্মি ধরে রাখার মাধ্যমে ড্রোনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ অতিরিক্ত উত্তপ্ত করে অকার্যকর বা ধ্বংস করা যায়।ডিরেক্টেড এনার্জি কনসালট্যান্টসের সভাপতি মার্ক নিসের ভাষ্য অনুযায়ী, লেজার দিয়ে ড্রোনের গতিপথ অনুসরণ করে নির্দিষ্ট অংশে নিখুঁতভাবে আঘাত করা সম্ভব। এতে ড্রোনের সেন্সর অকার্যকর করার পাশাপাশি পুরো উড়োজাহাজ ধ্বংসও করা যেতে পারে।যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গবেষণার নথিতেও উচ্চক্ষমতার লেজার প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুবিধা হিসেবে দ্রুত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত, উচ্চ নির্ভুলতা এবং প্রচলিত গোলাবারুদের তুলনায় কম অতিরিক্ত খরচের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।কেন এক্সবক্স কন্ট্রোলারলেজার অস্ত্র পরিচালনায় গেমিং কনসোলের মতো কন্ট্রোলার ব্যবহারের কারণ হিসেবে সামরিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অত্যাধুনিক লক্ষ্যনিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির অনেক উপাদান গেমিং শিল্পে আগে থেকেই উন্নত হয়েছে। ফলে সামরিক ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কন্ট্রোল ব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজন কমে যায়।‘লেজার ওয়ার্স’ নিউজলেটারের সম্পাদক জ্যারেড কেলার বলেন, গেমিং শিল্প যখন কার্যকর কন্ট্রোলার তৈরি করেছে, তখন সামরিক বাহিনীর জন্য নতুন করে একই ধরনের ব্যবস্থা উদ্ভাবনের প্রয়োজন নেই। তিনি বিষয়টি বোঝাতে ‘হ্যালো’ গেমের স্পার্টান লেজারের উদাহরণও টেনেছেন।৬০ কিলোওয়াটের হেলিওসহরমুজে ব্যবহৃত ব্যবস্থার মধ্যে ‘হাই-এনার্জি লেজার উইথ ইন্টিগ্রেটেড অপটিক্যাল ড্যাজলার অ্যান্ড সার্ভেইল্যান্স’ বা হেলিওস (HELIOS) রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ব্যবস্থায় ৬০ কিলোওয়াট ক্ষমতার লেজার ব্যবহার করা হয় এবং এটি ড্রোনসহ বিভিন্ন আকাশপথের লক্ষ্যবস্তু মোকাবিলায় সক্ষম। বড় আকার ও উচ্চ শক্তির প্রয়োজন হওয়ায় এসব ব্যবস্থা মূলত যুদ্ধজাহাজে স্থাপন করা হয়।এ ছাড়া বোয়িংয়ের তৈরি ‘কমপ্যাক্ট লেজার ওয়েপন সিস্টেম’ (CLWS) তুলনামূলক বড় আকারের গ্রুপ-৩ শ্রেণির ড্রোন মোকাবিলায় ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।সীমাবদ্ধতাও রয়েছেলেজার অস্ত্রের সক্ষমতার পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কার্যকরভাবে কাজ করার জন্য সাধারণত পরিষ্কার আকাশ প্রয়োজন। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোনের ঝাঁক আক্রমণ করলে একটি লেজার ব্যবস্থা সব লক্ষ্যবস্তু দ্রুত মোকাবিলা করতে নাও পারতে পারে। এ ছাড়া বর্তমান সিস্টেমগুলো আকারে বড় ও ভারী হওয়ায় ব্যক্তিগত অস্ত্র হিসেবে সৈন্যদের বহন করার মতো পর্যায়ে পৌঁছেনি।প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হরমুজ ও সীমান্ত এলাকায় ব্যবহৃত লেজার ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের নজির পাওয়া যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত শক্তি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তি সামরিক প্রতিরক্ষা ও রসদ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের নথি।