সন্তানকে কঠোর শাসনের বদলে তার অনুভূতি বোঝা, শারীরিক শাস্তি এড়িয়ে কথোপকথনের মাধ্যমে আচরণ সংশোধন এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ দেওয়া—সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘জেন্টল প্যারেন্টিং’ নামে পরিচিত এই ধারণা অভিভাবকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। তবে এই পদ্ধতির সীমা কোথায়, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন ‘এফএএফও প্যারেন্টিং’—‘মেস অ্যারাউন্ড অ্যান্ড ফাইন্ড আউট’—ধারণাটিও আলোচিত হচ্ছে। এর মূল বক্তব্য হলো, সন্তানকে সব ধরনের অস্বস্তি বা সমস্যার হাত থেকে রক্ষা না করে তার সিদ্ধান্তের স্বাভাবিক পরিণতি বুঝতে দেওয়া।তবে প্যারেন্টিং নিয়ে আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা একটি বিষয় স্পষ্ট করছেন—কোমল প্যারেন্টিং মানে শিশুকে কোনো সীমারেখা ছাড়া বড় করা নয়। আবার স্বাভাবিক পরিণতি বুঝতে দেওয়া আর ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুকে কষ্ট দেওয়া বা ভয় দেখানোও এক বিষয় নয়।কোমলতা মানেই সীমাহীন স্বাধীনতা নয়‘জেন্টল প্যারেন্টিং’ বলতে সাধারণভাবে শিশুর অনুভূতি ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ভয় বা শারীরিক শাস্তির পরিবর্তে যোগাযোগ, সহানুভূতি ও বয়সোপযোগী সীমারেখার মাধ্যমে আচরণ পরিচালনাকে বোঝানো হয়।এই পদ্ধতিতে শিশুর অনুভূতিকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি নয়, সেটিও স্পষ্ট করে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ শিশুর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন নির্ধারণ—দুটি বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়।‘এফএএফও’ নিয়ে নতুন আলোচনাসামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাম্প্রতিক আলোচনায় ‘এফএএফও প্যারেন্টিং’কে অনেক সময় জেন্টল প্যারেন্টিংয়ের বিপরীত হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর প্রবক্তাদের যুক্তি, সন্তানকে প্রতিটি অস্বস্তি বা সমস্যার হাত থেকে সরিয়ে রাখলে সে বাস্তব জীবনের সিদ্ধান্ত ও তার ফলাফল মোকাবিলা করতে শিখবে না।যেমন, শিশু খেলনা গুছিয়ে না রাখলে পরে সেটি খুঁজে না পাওয়াকে তার কাজের একটি স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু শিক্ষা দেওয়ার নামে শিশুকে অপমান করা, ভয় দেখানো কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।প্যারেন্টিংয়ের ক্ষেত্রে তাই স্বাভাবিক পরিণতি এবং শাস্তি—এই দুইয়ের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণও হতে পারে সমস্যাঅন্যদিকে ‘হেলিকপ্টার প্যারেন্টিং’ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। এ ধরনের প্যারেন্টিংয়ে অভিভাবক সন্তানের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ রাখেন। সন্তানকে ভুল করার সুযোগও অনেক সময় দেওয়া হয় না।সন্তানের নিরাপত্তা ও সাফল্য নিশ্চিত করতে গিয়ে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ তার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যা সমাধান এবং দায়িত্বশীল হয়ে ওঠার সুযোগ সীমিত করতে পারে—এমন আলোচনা প্যারেন্টিং গবেষণায় রয়েছে।এর বিপরীতে ‘ফ্রি-রেঞ্জ’ প্যারেন্টিং শিশুকে বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী কিছুটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সীমিত ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়। তবে এখানেও শিশুর বয়স, নিরাপত্তা, পরিস্থিতি ও ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনা করা জরুরি।‘বেটা মম’ বৈজ্ঞানিক কোনো শ্রেণিবিভাগ নয়সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে ‘বেটা মম’ শব্দটিও দেখা যাচ্ছে। তবে এটি কোনো প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক প্যারেন্টিং শ্রেণিবিভাগ নয়। অনলাইনে সাধারণত এমন মায়েদের বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হয়, যারা সন্তানের হয়ে অতিরিক্ত কাজ করে দেন, তাকে অতিরিক্ত সুবিধা দেন কিংবা নিজের দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ কম দেন।ফলে এ ধরনের শব্দকে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ধারণা হিসেবে না দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত একটি লেবেল হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।ভালোবাসার সঙ্গে প্রয়োজন সীমারেখারওপ্যারেন্টিং নিয়ে আলোচনায় মূল বিষয়টি জেন্টল প্যারেন্টিং বনাম কঠোর প্যারেন্টিংয়ের দ্বন্দ্ব নয়; বরং দুই চরম অবস্থান এড়িয়ে চলা।শিশুকে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যেমন দীর্ঘমেয়াদে বাবা-মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে, তেমনি কোনো সীমারেখা না দিয়ে শিশুর সব আচরণ মেনে নেওয়াও সমস্যার কারণ হতে পারে। সন্তানের অনুভূতিকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি গ্রহণযোগ্য আচরণের স্পষ্ট সীমা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথাই গুরুত্ব পাচ্ছে।অস্ট্রেলিয়ার প্যারেন্টিং বিশেষজ্ঞ জাস্টিন কলসনের আলোচনাতেও ভালোবাসা, সীমারেখা ও আনন্দকে শিশুপালনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর আলোচনার সারকথা হলো, শিশুদের জন্য কোনো চরম প্যারেন্টিং স্টাইল নয়; বরং ভালোবাসা, স্পষ্ট সীমা এবং ইতিবাচক পারিবারিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়ছে প্যারেন্টিংয়ের চাপবর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্যারেন্টিংয়ের ধারণা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখছে। প্রতিদিনই নতুন কোনো পদ্ধতি, ভিডিও কিংবা পরামর্শ সামনে আসছে। এতে অনেক অভিভাবকের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে সন্তান পালনের জন্য একটি নির্দিষ্ট ‘সঠিক ফর্মুলা’ অনুসরণ করতেই হবে।এর ফলে প্যারেন্টিং নিয়ে অপরাধবোধ ও উদ্বেগও বাড়তে পারে। বাস্তবে প্রতিটি শিশুর বয়স, স্বভাব, বিকাশের স্তর এবং পারিবারিক পরিবেশ আলাদা। তাই একটি পদ্ধতি সব শিশুর ক্ষেত্রে একইভাবে কার্যকর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।তবে নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য পারিবারিক সম্পর্ক, বয়সোপযোগী স্বাধীনতা, স্পষ্ট নিয়ম, ধারাবাহিকতা এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ—এসব বিষয় শিশুর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।লক্ষ্য হওয়া উচিত ভারসাম্যসন্তানকে জীবনের সব বিপদ থেকে দূরে রাখা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি তাকে সব সমস্যার মুখোমুখি একা দাঁড় করিয়ে দেওয়াও দায়িত্বশীল প্যারেন্টিং নয়। বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে শিশু ভুল করতে পারে, নিজের ভুলের স্বাভাবিক পরিণতি বুঝতে পারে এবং প্রয়োজন হলে বাবা-মায়ের কাছ থেকে সহায়তা পায়।জেন্টল প্যারেন্টিং নিয়ে বর্তমান বিতর্ক শেষ পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—সন্তানের প্রতি কোমলতা ও প্রয়োজনীয় সীমারেখা কি একই সঙ্গে বজায় রাখা সম্ভব?প্যারেন্টিং নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনার বড় অংশের বক্তব্য হলো, এই দুটিকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। শিশুকে ভালোবাসা, তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং একই সঙ্গে তাকে দায়িত্ব, নিয়ম ও সীমারেখা শেখানো—সবই সুস্থ পারিবারিক সম্পর্কের অংশ হতে পারে।তথ্যসূত্র: দৈনিক আমার দেশ, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬; প্যারেন্টিং-সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ আলোচনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত সাম্প্রতিক ধারণা।