কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কীটনাশকের ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় হলেও অতিরিক্ত, ভুল মাত্রায়, ভুল সময়ে কিংবা নিষিদ্ধ ও অননুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহারে কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। মাটি ও পানি দূষণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপকারী জীব ও জীববৈচিত্র্য। একই সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়ছেন কৃষক ও ভোক্তারা।বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, কীটনাশকের নেতিবাচক প্রভাবের মধ্যে মাটি ও পানি দূষণ এবং অলক্ষ্য জীবের ক্ষতির বিষয়টি রয়েছে। বাংলাদেশেও বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কৃষিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার রোধে কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি মাটি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরে কৃষি শিক্ষা, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন।প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ব্যবহারই বড় উদ্বেগবাংলাদেশের কৃষিতে সমস্যা শুধু কীটনাশকের ব্যবহার নয়; বরং এর অপ্রয়োজনীয় ও অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ। অনেক ক্ষেত্রে রোগ বা পোকার সঠিক পরিচয় না জেনেই জমিতে কীটনাশক দেওয়া হয়। একই সঙ্গে একাধিক কীটনাশক ব্যবহারের প্রবণতা, নির্ধারিত মাত্রা না মানা, ফসল কাটার আগে অপেক্ষাকাল অনুসরণ না করা এবং নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষার ঘটনাও রয়েছে।কৃষকের পর্যাপ্ত কারিগরি জ্ঞানের ঘাটতি, বিক্রেতার বাণিজ্যিক পরামর্শের ওপর নির্ভরতা, রোগ-পোকা শনাক্তকরণে দুর্বলতা, দ্রুত ফল পাওয়ার প্রবণতা এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শের সীমাবদ্ধতা এর অন্যতম কারণ। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি উপকারী পোকামাকড় ও অন্যান্য জীব ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কৃষকের আর্থিক ক্ষতিও হতে পারে।নতুন নীতির উদ্যোগত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠনের পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের জুলাইয়ে নতুন কীটনাশক নীতি প্রণয়নে ১৯ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। প্রস্তাবিত নীতিতে কীটনাশকের ব্যবহার, আমদানি, নিবন্ধন, গুণগত মান ও নিরাপদ প্রয়োগকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।নীতির অন্যতম লক্ষ্য মাটি, পানি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কীটনাশক নিবন্ধন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। মাঠে পণ্যটি কীভাবে বিক্রি হচ্ছে, কৃষককে কে পরামর্শ দিচ্ছে, কী মাত্রায় প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং ফসল তোলার আগে অপেক্ষাকাল মানা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন।প্রশিক্ষণ ছাড়া ডিলারশিপ নয়কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহারে কৃষকের পাশাপাশি ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিমন্ত্রী অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে কৃষকদের মধ্যে ক্যানসারসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরির কথা উল্লেখ করে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রমের কথা জানিয়েছেন।এ ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ সনদ ছাড়া নতুন ডিলারশিপ না দেওয়া এবং বিদ্যমান ডিলারশিপ নবায়নের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণকে শর্ত করা যেতে পারে। এতে কীটনাশক বিক্রি কেবল বাণিজ্যিক কার্যক্রম না থেকে দায়িত্বশীল ও প্রশিক্ষণভিত্তিক সেবায় পরিণত হতে পারে।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০২৬ সালে পিআরআইএসএম প্ল্যাটফর্মে বালাইনাশক লাইসেন্সিং অটোমেশন চালু এবং ম্যানুয়াল লাইসেন্স প্রদান বন্ধের বিষয়ে নোটিশ দিয়েছে। ডিজিটাল লাইসেন্সিংয়ের সঙ্গে প্রশিক্ষণ সনদ যুক্ত করা গেলে প্রশিক্ষিত ডিলারদের একটি স্বচ্ছ ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা সম্ভব।নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহারে কৃষককে প্রশিক্ষণইউনিয়ন বা উপজেলা পর্যায়ে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের ‘নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহারকারী কৃষক’ হিসেবে সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রশিক্ষণে রোগ ও পোকা শনাক্তকরণ, কখন কীটনাশক প্রয়োজন এবং কখন প্রয়োজন নেই, অনুমোদিত পণ্য নির্বাচন, সঠিক মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার, ফসল কাটার আগে অপেক্ষাকাল এবং কীটনাশক মিশ্রণের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া প্রয়োজন।এর সঙ্গে খালি বোতল ও প্যাকেটের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) এবং জৈবিক ও অরাসায়নিক পদ্ধতিতে বালাই নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। প্রশিক্ষণ একবারের জন্য নয়, নির্দিষ্ট সময় পরপর পুনঃপ্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।কম কীটনাশক ব্যবহারে প্রণোদনাশুধু আইন ও শাস্তির মাধ্যমে কৃষকের আচরণ পরিবর্তন কঠিন। এ জন্য প্রণোদনা ও স্বীকৃতির ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। দুই বছর ধারাবাহিকভাবে অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় প্রয়োগ কমানো কৃষকদের ‘নিরাপদ কৃষক’ বা ‘লো-পেস্টিসাইড কৃষক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে।নিরাপদ উৎপাদিত পণ্যের জন্য আলাদা বাজারপরিচিতি, সার্টিফিকেশন, বাজারসংযোগ কিংবা প্রশিক্ষণে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থাও করা সম্ভব। এতে কম কীটনাশক ব্যবহারকে শুধু নিষেধাজ্ঞা হিসেবে নয়, বরং উৎপাদন ব্যয় কমানো, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও বাজারমূল্য বাড়ানোর সুযোগ হিসেবেও কৃষকের কাছে তুলে ধরা যাবে।কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকিকীটনাশকের সঙ্গে কৃষকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে বাংলাদেশের কৃষকদের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট রোগ বা ক্যানসারের জন্য এককভাবে কীটনাশককে দায়ী করার আগে স্থানীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা, এক্সপোজার ডেটা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যতথ্য প্রয়োজন।আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কিছু কীটনাশকের সঙ্গে মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি এক্সপোজারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই ঝুঁকি কমানোর মূলনীতি হওয়া উচিত—প্রয়োজন ছাড়া কীটনাশক নয়; প্রয়োজন হলে সঠিক পণ্য, সঠিক মাত্রা, সঠিক সময় ও সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার।কৃষকের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মাস্ক, গ্লাভস, সুরক্ষা পোশাক ও চোখের সুরক্ষা ব্যবহারের পাশাপাশি কীটনাশক মেশানো ও স্প্রে করার সময় নিরাপত্তা বিধি মেনে চলা জরুরি।মাটির সুরক্ষায় নজরদারি জরুরিমাটি শুধু ফসল উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি একটি জীবন্ত পরিবেশব্যবস্থা। অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহারে মাটির উপকারী অণুজীবসহ বিভিন্ন জীবের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। এফএও কীটনাশকের সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব হিসেবে মাটি ও পানি দূষণ এবং অলক্ষ্য জীবের ক্ষতির কথা উল্লেখ করেছে।বাংলাদেশের ঘনবসতিপূর্ণ কৃষিপ্রধান বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিজমির কাছাকাছিই রয়েছে বসতবাড়ি, পুকুর, খাল ও জলাশয়। ফলে একটি জমিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের প্রভাব শুধু ওই জমির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।এ জন্য মাটি পরীক্ষা, কীটনাশক ব্যবহারের রেকর্ড সংরক্ষণ, ফসলভিত্তিক সুপারিশ এবং ডিজিটাল কৃষি পরামর্শ জোরদার করা প্রয়োজন।খালি বোতল ও প্যাকেটের নিরাপদ নিষ্পত্তিকীটনাশক ব্যবহারের পর খালি বোতল, প্যাকেট বা কনটেইনার যত্রতত্র ফেলে দেওয়াও পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এসব পাত্রে থাকা অবশিষ্ট রাসায়নিক মাটি ও পানিতে মিশে যেতে পারে এবং শিশু, গবাদিপশু ও মানুষের জন্য বিপদ তৈরি করতে পারে।এফএও ২০২৫ সালে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় খালি কীটনাশক প্যাকেজিং সংগ্রহ ও নিরাপদ নিষ্পত্তির একটি পাইলট কর্মসূচি শুরু করেছিল। এ ধরনের উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের পাশাপাশি ডিলারের মাধ্যমে খালি বোতল ফেরত নেওয়ার ‘টেক-ব্যাক’ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।আইন প্রয়োগে জোর প্রয়োজনবিষাক্ত ও উচ্চঝুঁকির কীটনাশকের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আইন বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যমান আইনে নিবন্ধিত কীটনাশকের জন্য লাইসেন্সের বিধান রয়েছে এবং নিবন্ধিত ব্র্যান্ড ছাড়া কীটনাশক আমদানি, বিক্রি ও মজুদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।এখন প্রয়োজন ঝুঁকিভিত্তিক আধুনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। কোন পণ্য উচ্চঝুঁকির, কোনটি পর্যায়ক্রমে সীমিত বা নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন, কোন ফসলে কোন পণ্য অনুমোদিত এবং কী মাত্রায় ব্যবহার করা যাবে—এসব তথ্য সহজ বাংলায় কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি।সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনাই হতে পারে পথবাংলাদেশের কৃষির লক্ষ্য শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়; নিরাপদ, লাভজনক, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করাও এর অংশ। তাই কীটনাশককে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজনভিত্তিক ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম), বৈজ্ঞানিক কৃষি পরামর্শ, প্রশিক্ষিত ডিলার ও কৃষক এবং অনুমোদিত কীটনাশকের সঠিক প্রয়োগ—এই ব্যবস্থাগুলো একসঙ্গে কার্যকর করা জরুরি। রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক সতর্কতা, কৃষকদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ এবং নতুন কীটনাশক নীতি প্রণয়নের পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে নিরাপদ খাদ্য ও টেকসই কৃষি নিশ্চিত করার পথে অগ্রগতি সম্ভব।আগামী দুই বছরকে ‘নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহার ও কৃষক স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি’ হিসেবে বিবেচনা করে প্রশিক্ষিত ডিলার ও কৃষক, ডিজিটাল লাইসেন্সিং, কীটনাশক ব্যবহারের রেকর্ড, খালি প্যাকেট ফেরত নেওয়া, মাটি-পানি পর্যবেক্ষণ এবং কম কীটনাশক ব্যবহারকারী কৃষকের স্বীকৃতির মতো কার্যক্রম হাতে নেওয়া যেতে পারে।কৃষকের স্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় কীটনাশকের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখন শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। এ ক্ষেত্রে উৎপাদক, আমদানিকারক, ডিলার, কৃষক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। কীটনাশক নিয়ন্ত্রণকে কাগজের লাইসেন্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠপর্যায়ের বাস্তব ব্যবস্থাপনায় নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।