ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে ১০০ নম্বরের অভিন্ন কাঠামো চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই কাঠামোয় খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, শ্রেণিকৃত ও অবলোপন করা ঋণ আদায়, বড় ঋণগ্রহীতার ঝুঁকি কমানোসহ ৩০টি মূল কর্মদক্ষতা সূচক (কেপিআই) নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে এমডি বা সিইওর মোট স্কোর থেকে সরাসরি নম্বর কেটে নেওয়া হবে।রোববার এ বিষয়ে অভিন্ন ‘কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর’ (কেপিআই) নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংক ও আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতেই এই অভিন্ন কেপিআই ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন করা হয়েছে।পাঁচ ক্ষেত্রে ১০০ নম্বরনতুন কাঠামোয় এমডি ও সিইওর কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে পাঁচটি ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকের সম্পদের মানের জন্য ২৫ শতাংশ, মূলধন ও তারল্যের জন্য ২৫ শতাংশ, মুনাফার জন্য ১০ শতাংশ, সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ২৫ শতাংশ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, গ্রাহকসেবা ও বাজার আচরণের জন্য ১৫ শতাংশ নম্বর রাখা হয়েছে।খেলাপি ঋণই বড় পরীক্ষাএমডি ও সিইওদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে বড় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে। সম্পদের মান যাচাইয়ের সূচকে মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত, নিট খেলাপি ঋণের অনুপাত, পুনর্গঠিত ও পুনঃতফসিল করা ঋণ, বড় ঋণ ও শীর্ষ ঋণগ্রহীতার কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি কমানো এবং শ্রেণিকৃত ও অবলোপন করা ঋণ আদায়ের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত সংশ্লিষ্ট শিল্প ও সমপর্যায়ের ব্যাংকের গড়ের নিচে রাখতে হবে। সময়ের সঙ্গে এ অনুপাত কমানোরও লক্ষ্য থাকতে হবে। নিট খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রেও একইভাবে নিম্নমুখী প্রবণতা নিশ্চিত করতে হবে।শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমেছে কি না, সেটিই দেখা হবে না। গত ছয় মাসে খেলাপি ঋণ এবং অবলোপন করা ঋণ থেকে কত টাকা আদায় হয়েছে, তাও কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে বিবেচনায় নেওয়া হবে।ব্যর্থ হলে সরাসরি নম্বর কর্তনছয়টি সূচকের ক্ষেত্রে রাখা হয়েছে সবচেয়ে কঠোর ব্যবস্থা। এগুলো হলো—অ্যাডভান্স ডিপোজিট রেশিও, মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত, নিট খেলাপি ঋণের অনুপাত, বড় ঋণ ও শীর্ষ ঋণগ্রহীতার কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি, শ্রেণিকৃত ও অবলোপন করা ঋণ আদায় এবং সিএমএসএমই, কৃষি, গ্রিন ফাইন্যান্স ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কার্যক্রম।বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, এসব সূচকের কোনো একটিতে নির্ধারিত লক্ষ্যের ৫০ শতাংশের কম অর্জন হলে অথবা সংশ্লিষ্ট সূচকে শূন্য স্কোর হলে মোট কর্মদক্ষতার স্কোর থেকে নম্বর কাটা হবে। সংশ্লিষ্ট কেপিআইয়ের সর্বোচ্চ স্কোরের ২৫ শতাংশ কেটে নেওয়া হবে। একাধিক সূচকে ব্যর্থ হলে প্রতিটির জন্য আলাদাভাবে নম্বর কর্তন হবে।কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, কোনো এমডির মোট স্কোর ৭৫ দশমিক ৫০ হলে এবং তিনি মোট খেলাপি ঋণের অনুপাতের নির্ধারিত লক্ষ্যের ৫০ শতাংশও অর্জন করতে না পারলে তার স্কোর থেকে ১ দশমিক ৫৬ নম্বর কাটা যাবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের সূচকেও ব্যর্থ হলে কর্তনের পরিমাণ আরও বাড়বে। ছয়টি সূচকেই ব্যর্থ হলে উদাহরণ অনুযায়ী মোট স্কোর থেকে ৬ দশমিক ৮১ নম্বর কাটা যাবে।ছয় মাস পরপর মূল্যায়নএমডি ও সিইওর কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন হবে ছয় মাস পরপর। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে এমডি ও সিইওর মেয়াদের শুরুতেই লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। বর্তমান এমডিদের ক্ষেত্রে সার্কুলার জারির এক মাসের মধ্যে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে তিন বছর বা অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য। এরপর প্রতি ছয় মাসে কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা হবে। বর্তমান এমডি ও সিইওদের প্রথম মূল্যায়নকাল হবে আগামী ১ অক্টোবর থেকে ৩১ মার্চ ২০২৭ পর্যন্ত।মূল্যায়ন শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে পরিচালনা পর্ষদকে প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যায়ন করে এমডি ও সিইওর বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা বা পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করতে পারবে।বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, প্রতিটি কেপিআইয়ের নির্ধারিত লক্ষ্যের অন্তত ৫০ শতাংশ অর্জন না করলে কোনো স্কোর পাওয়া যাবে না। ৫০ শতাংশ বা তার বেশি অর্জন করলে লক্ষ্যমাত্রার অনুপাতে স্কোর দেওয়া হবে। সব সূচকের স্কোর যোগ করে এমডি ও সিইওর চূড়ান্ত কর্মদক্ষতা নির্ধারণ করা হবে।বেতন-ভাতা নির্ধারণেও প্রভাবসার্কুলার অনুযায়ী, চূড়ান্ত স্কোর ৭৫ বা তার বেশি হলে কর্মদক্ষতা ‘অ্যাবাভ অ্যাভারেজ’, ৬৫ থেকে ৭৫-এর কম হলে ‘অ্যাভারেজ’ এবং ৬৫-এর কম হলে ‘বিলো অ্যাভারেজ’ হিসেবে বিবেচিত হবে।বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ‘অ্যাভারেজ’ কর্মদক্ষতায় উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। আর ‘বিলো অ্যাভারেজ’ কর্মদক্ষতা নিম্নমানের হিসেবে বিবেচিত হবে, যেখানে তাৎক্ষণিক উন্নতি প্রয়োজন। এমডি বা সিইওর বেতন-ভাতা, প্রণোদনা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণেও এই স্কোরকার্ড ব্যবহার করা হবে।দায় এড়ানোর সুযোগ কমছেব্যাংকের এমডি ও সিইও নিয়োগ এবং পুনর্নিয়োগের সময় খেলাপি ঋণ কমানো ও অবলোপন করা ঋণ আদায়ের লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা আগেই দেওয়া হয়েছিল। এবার সেই লক্ষ্যকে আরও কাঠামোবদ্ধ করে পরিমাপযোগ্য কেপিআইয়ের আওতায় আনা হলো।পুনর্নিয়োগের সময় পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ফলে নতুন কাঠামো কার্যকর হলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পরও শুধু মুনাফা বা ব্যবসা সম্প্রসারণের ওপর ভিত্তি করে এমডির ভালো কর্মদক্ষতা দাবি করার সুযোগ সীমিত হবে।ঋণের মান, ঋণ আদায়, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসনের বাস্তব ফলাফলও এমডি ও সিইওর কর্মদক্ষতার স্কোরে প্রতিফলিত হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ধারাবাহিকভাবে দুর্বল কর্মদক্ষতার ক্ষেত্রে এমডি বা সিইওর মেয়াদ নবায়ন নাও হতে পারে। এমনকি তাদের অপসারণের ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।