কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার ঝাউদিয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত ঝাউদিয়া গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে শত বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ। মুঘল স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত এই মসজিদটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের পাশাপাশি জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শত শত দর্শনার্থী মসজিদটি দেখতে এলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। দীর্ঘদিন সংস্কার ও উন্নয়ন না হওয়ায় মসজিদটির জৌলুসও কমতে শুরু করেছে।স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মসজিদের মূল কাঠামোয় রয়েছে তিনটি গম্বুজ। চার কোণে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন মিনারসদৃশ উঁচু কাঠামো। দেয়াল, খিলান ও গম্বুজের নকশায় ফুটে উঠেছে প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের বৈশিষ্ট্য। ইট ও চুন-সুরকির নির্মাণশৈলী এবং নান্দনিক কারুকাজ মসজিদটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি।শাহজাহানের আমলে নির্মাণের দাবিস্থানীয় ইতিহাস ও প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, মুঘল সম্রাট শাহজাহানের আমলে ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় তিন শত বছর আগে সম্রাট শাহজাহান মসজিদটির নির্মাণ ব্যয় বহন করেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। নির্মাণকাজ পরিচালনা করেন উপমহাদেশ থেকে আসা ধর্মপ্রচারক শাহ সুফি আদারী মিয়া চৌধুরী। তিনি ৮৫ বছর বয়সে ঝাউদিয়ায় মারা যান। ধর্ম প্রচারের সময় তিনি বিয়ে করেননি বলেও স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।দেশে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে আগত ওলি-আউলিয়ারা মসজিদকে ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠিত হয় বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে হস্তান্তরজানা যায়, ১৯৬৯ সালে স্থানীয় সুনামধন্য ব্যক্তি হাসান চৌধুরী তৎকালীন সরকারের সঙ্গে একটি নিবন্ধিত চুক্তির মাধ্যমে মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেন। চুক্তি অনুযায়ী, হাসান আলী চৌধুরী অথবা তাঁর বংশধরদের মধ্য থেকে মসজিদের মোতাওয়ালি বা তত্ত্বাবধায়ক থাকার কথা। বর্তমানে তাঁর বংশধরদের নিয়ে গঠিত মসজিদ কমিটি এটি পরিচালনা করছে বলে জানা গেছে।দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মসজিদের প্রাচীন স্থাপত্য দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে। স্থানীয় মুসল্লিদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকেরা এখানে আসেন।নেই পর্যাপ্ত পর্যটন সুবিধাদর্শনার্থীদের ভিড় থাকলেও সেখানে পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা নেই। থাকা ও খাওয়ার সুবিধাও সীমিত। ফলে দর্শনীয় স্থান হিসেবে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে মসজিদটি কাঙ্ক্ষিত পরিচিতি পাচ্ছে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।বিশেষ করে শুক্রবার মসজিদ প্রাঙ্গণে দর্শনার্থী ও মুসল্লিদের ব্যাপক সমাগম হয়। অনেকেই মানত হিসেবে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়ে আসেন। মসজিদকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কিছু কুটিরশিল্পের মানুষও জীবিকা নির্বাহ করছেন।মসজিদটি অলৌকিকভাবে নির্মিত হয়েছে—এমন বিশ্বাসও স্থানীয় অনেকের মধ্যে রয়েছে। এ কারণে প্রতি সপ্তাহেই দূর-দূরান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ মসজিদটি দেখতে আসেন।স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ শুধু একটি পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি কুষ্টিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক। যথাযথ সংরক্ষণ, সংস্কার এবং দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে মসজিদটি কুষ্টিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে। প্রাচীন এই স্থাপনার ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যমূল্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।