আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ, তাঁদের উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি সংহতি জানাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন দিবসটি উপলক্ষে কর্মসূচি নিয়েছে।জোরপূর্বক গুম বিশ্বব্যাপী একটি গুরুতর মানবাধিকার সমস্যা। বিশেষ করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা বেশি ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক কর্মীদের দমনে গুমকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে। এর ফলে নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার দীর্ঘদিন তাঁদের স্বজনের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানতে পারে না এবং ন্যায়বিচার থেকেও বঞ্চিত হয়।জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়ে আসছে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, তাঁদের স্মরণ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানানোই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য।গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ইতিহাস আরও পুরোনো। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গুম হওয়া সব ব্যক্তির সুরক্ষায় একটি আন্তর্জাতিক সনদের প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ কার্যকর হয়। এই সনদের আওতায় ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ভয়াবহতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা, এ ধরনের অপরাধ বন্ধে রাষ্ট্রগুলোর ওপর জবাবদিহির চাপ সৃষ্টি, দায়মুক্তি রোধ এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। বাংলাদেশেও ২০১১ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটবাংলাদেশে গুমের ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপকভাবে আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন ব্যক্তিকে গুম করে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে। গুম কমিশন ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে এসব ঘটনার নানা তথ্য উঠে এসেছে।বিশেষ করে ওই সময় বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, মানবাধিকারকর্মী এবং সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের গুম হওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাঁদের স্বজনদের তুলে নিয়ে যাওয়া হলেও পরে তাঁদের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের পর গুমের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। গুমের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক আবেদন করা হয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও বিচার চেয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছেন।এদিকে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করে। এর আগে দীর্ঘদিন জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে সনদটিতে স্বাক্ষরের আহ্বান জানানো হলেও তৎকালীন সরকার এতে সম্মতি দেয়নি।গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলগুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের অধিকার সংরক্ষণ এবং মানবাধিকার, ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।গত ২৭ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। পরে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বিলটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।বিলে গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।এ ছাড়া গুমের কারণে ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে, মরদেহ উদ্ধার হলে অথবা পাঁচ বছর পরও নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান না পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন গোপন বন্দিশালা থেকে দীর্ঘদিন পর কয়েকজন ব্যক্তি মুক্ত হয়ে ফিরে আসেন। এরপর গুমের অভিযোগ ও এর সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবি আরও জোরালো হয়।বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে সাত শতাধিক মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তির সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।আন্তর্জাতিক সনদে বাংলাদেশের স্বাক্ষরবাংলাদেশ জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক নয়টি মূল সনদের মধ্যে আটটিতে আগেই অনুস্বাক্ষর করেছিল। তবে জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের আহ্বান সত্ত্বেও বিগত সরকার গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেনি।পরে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত এই সনদে ৩২টি দেশ অনুস্বাক্ষর করার পর ২০১০ সাল থেকে এর আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন শুরু হয়।সনদটির মূল লক্ষ্য গুমের ঘটনা বন্ধ করা, এ অপরাধে দায়মুক্তির অবসান ঘটানো, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সার্বিক সহায়তা নিশ্চিত করা।আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো গুমের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছে।