কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বাইশগাঁও ইউনিয়নের শরীফপুর গ্রামে প্রায় ৪০০ বছর ধরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন ‘গায়েবি মসজিদ’। মুঘল আমলের স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদের নান্দনিক সৌন্দর্য এখনো দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে মানুষ মসজিদটি দেখতে আসেন। বিশেষ করে শুক্রবার মুসল্লি ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বেড়ে যায়।স্থানীয় সূত্র ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কুমিল্লা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বাইশগাঁও ইউনিয়নের শরীফপুর গ্রামে ১৬৫৭ সালে প্রাচীন মুঘল আমলের এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। প্রায় চার শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও মসজিদটির সৌন্দর্য অনেকটাই অটুট রয়েছে। চুন-সুরকিতে নির্মিত মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী এখনো দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে।মসজিদটির অবস্থান তিন জেলার মিলনস্থলের কাছাকাছি। এর উত্তর-পশ্চিমে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে কিছু দূর এগোলেই নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলা। মসজিদের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ২৯ একর আয়তনের বিশাল নাটেশ্বর দিঘি। দিঘির পূর্ব-উত্তর কোণে মসজিদটির অবস্থান।মসজিদের পাশেই রয়েছে বিশাল আকৃতির নাটেশ্বর রাজার দিঘি। দিঘির পূর্ব পাড়ে রয়েছে বাগদাদ থেকে আগত হজরত শাহ শরীফ বাগদাদী (র.)-এর মাজার। দিঘির পাড়, মসজিদ ও আশপাশের পরিবেশ মিলে স্থানটি দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকেও মসজিদটি বেশ বৈচিত্র্যময়। এর কেন্দ্রীয় মেহরাবটি অপর দুটি মেহরাবের তুলনায় বড়। মসজিদের চার কোণে রয়েছে চারটি বড় অষ্টভুজাকার মিনার। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের ওপর রয়েছে আরও দুটি অষ্টভুজাকার মিনার। মসজিদের কেন্দ্রীয় গম্বুজটি অপেক্ষাকৃত বড়। গম্বুজের ভেতরের অংশে পাতার নকশা এবং বাইরের অংশে রয়েছে চক্র নকশার কারুকাজ।মসজিদের সামনের দেয়ালে ফারসি ভাষায় একটি শিলালিপি রয়েছে। সেখানে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে হায়াতে আবদুল করিমের নাম উল্লেখ রয়েছে।‘গায়েবি মসজিদ’ নামের পেছনে যে কথাস্থানীয়দের কেউ কেউ মসজিদটিকে ‘গায়েবি মসজিদ’ নামে অভিহিত করেন। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, হজরত শাহ শরীফ বাগদাদী (র.)-এর ইশারায় মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দে লাকসামের গাজীমুড়া গ্রামে হজরত করিম হায়দার (র.) এবং পশ্চিমগাঁওয়ে গাজী হায়দার (র.) অবস্থান করেন। তাঁরা দুই ভাই ছিলেন এবং ৩৬০ আউলিয়ার অন্তর্ভুক্ত এই দুই আউলিয়া লাকসাম এলাকায় ইসলাম প্রচারের জন্য ইয়েমেন থেকে এসেছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।মসজিদের ইমাম সামছুদ্দোহা বলেন, প্রতিদিনই অনেক মানুষ প্রাচীন এই মসজিদ দেখতে আসেন। বিশেষ করে শুক্রবার দূরদূরান্তের মানুষও এখানে এসে নামাজ আদায় করেন। মসজিদের সৌন্দর্য যাতে নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছেন।মসজিদ পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি মোতাহার হোসেন চৌধুরী বলেন, মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতনসহ মসজিদের সার্বিক বিষয় দেখাশোনা করে।তিনি জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটির সংস্কারকাজ করেছিল। বর্তমানে মসজিদের সৌন্দর্য ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য রক্ষায় কিছু জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে।প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ইতোমধ্যে পুরাকীর্তি হিসেবে প্রাচীন এই মসজিদটি সংরক্ষণ করেছে। দীর্ঘ ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলীর কারণে মসজিদটি স্থানীয়দের পাশাপাশি ইতিহাস-ঐতিহ্যপ্রেমী দর্শনার্থীদের কাছেও আকর্ষণের অন্যতম স্থান হয়ে উঠেছে।