কোমর থেকে নিতম্ব, ঊরু হয়ে পায়ের দিকে ব্যথা ছড়িয়ে পড়াকে অনেকেই সাধারণ কোমরব্যথা মনে করেন। তবে এ ধরনের ব্যথার পেছনে স্নায়ুতে চাপ, মেরুদণ্ডের ডিস্কের সমস্যা, পেশিতে টানসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। ব্যথার ধরন, অবস্থান ও সঙ্গে থাকা অন্যান্য উপসর্গের ওপর নির্ভর করে এর কারণও ভিন্ন হতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র ব্যথাকে অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।কোমর থেকে পায়ে ব্যথা কেন ছড়ায়কোমরের নিচের অংশ থেকে পায়ের দিকে গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু চলে গেছে। এসব স্নায়ুতে চাপ বা প্রদাহ হলে ব্যথা স্নায়ুর পথ ধরে নিতম্ব ও পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।কোমর থেকে পায়ে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ার উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো—
সায়াটিক নার্ভে চাপ বা প্রদাহ
মেরুদণ্ডের ডিস্কের সমস্যা
কোমরের পেশিতে টান
মেরুদণ্ডের বয়সজনিত ক্ষয়
স্পাইনাল স্টেনোসিস
দীর্ঘ সময় ভুল ভঙ্গিতে বসে থাকা
ভুলভাবে ভারী জিনিস তোলা
দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
অতিরিক্ত ওজন
কোমর বা মেরুদণ্ডে আঘাত
সায়াটিকা কীকোমর থেকে নিতম্ব হয়ে এক পায়ের দিকে ছড়িয়ে পড়া ব্যথাকে অনেক সময় সায়াটিকা বলা হয়। এ ধরনের ব্যথার সঙ্গে পায়ে ঝিনঝিন, অবশভাব, জ্বালাপোড়া বা দুর্বলতা থাকতে পারে। তবে কোমর থেকে পায়ে ব্যথা হলেই সেটিকে সায়াটিকা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রকৃত কারণ জানতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।যে লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারেকোমর থেকে পায়ের দিকে ব্যথা ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন—
কোমরে ব্যথা বা শক্তভাব
নিতম্বে ব্যথা
ঊরু ও পায়ের দিকে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া
পায়ে ঝিনঝিন করা
অবশ বা অসাড় অনুভূতি
জ্বালাপোড়া
বিদ্যুৎ চলার মতো তীব্র ব্যথা
পায়ের পেশিতে দুর্বলতা
হাঁটতে অস্বস্তি
দীর্ঘ সময় বসে থাকলে ব্যথা বেড়ে যাওয়া
কাশি বা হাঁচির সময় ব্যথা বেড়ে যাওয়া
ব্যথার ধরনতীব্র বা আকস্মিক ব্যথা: হঠাৎ ভারী জিনিস তোলা, পড়ে যাওয়া কিংবা পেশিতে টান লাগার পর এ ধরনের ব্যথা শুরু হতে পারে।উপতীব্র ব্যথা: কয়েক সপ্তাহ ধরে এ ব্যথা থাকতে পারে। সময়ের সঙ্গে এটি কমতেও পারে, আবার বাড়তেও পারে।দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা: দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা বা বারবার ফিরে আসা কোমরব্যথা দৈনন্দিন জীবন ও কর্মক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কোমরব্যথাকে সাধারণভাবে তীব্র, উপতীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী—এই সময়কালভিত্তিক শ্রেণিতে বিবেচনা করে।কারা বেশি ঝুঁকিতেকিছু মানুষের কোমরব্যথায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এর মধ্যে রয়েছেন—
দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন এমন ব্যক্তি
একটানা গাড়ি চালান এমন ব্যক্তি
নিয়মিত ভারী শ্রম করেন এমন ব্যক্তি
ভুল অঙ্গভঙ্গিতে দীর্ঘ সময় থাকেন এমন ব্যক্তি
নিয়মিত ব্যায়াম করেন না এমন ব্যক্তি
অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তি
বয়স্ক ব্যক্তি
আগে কোমরব্যথার ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তি
ধূমপায়ী
কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় শারীরিক চাপের মধ্যে থাকেন এমন ব্যক্তি
গবেষণায় কর্মক্ষেত্রের কিছু ঝুঁকি, ধূমপান ও অতিরিক্ত BMI-কে কোমরব্যথাজনিত অক্ষমতার বোঝার সঙ্গে সম্পর্কিত পাওয়া গেছে।কোন বয়সে বেশি দেখা যায়কোমরব্যথা যেকোনো বয়সে হতে পারে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বয়স বাড়ার সঙ্গে এর প্রকোপও বাড়ে। ৫০ থেকে ৫৫ বছর বয়সে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এ ব্যথার কারণে দৈনন্দিন কাজকর্মে অক্ষমতার প্রভাবও বেশি হতে পারে।কখন দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজনকোমর থেকে পায়ে ব্যথার সঙ্গে নিচের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি—
পায়ের দুর্বলতা দ্রুত বাড়ছে
দুই পায়ে তীব্র অবশভাব হচ্ছে
যৌনাঙ্গ বা ঊরুর ভেতরের অংশ অসাড় হয়ে যাচ্ছে
নতুন করে প্রস্রাব বা পায়খানা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয়েছে
গুরুতর আঘাতের পর কোমরব্যথা শুরু হয়েছে
জ্বরের সঙ্গে তীব্র কোমরব্যথা হচ্ছে
ব্যথা ক্রমশ বাড়ছে
দীর্ঘদিনেও ব্যথা কমছে না
রোগ নির্ণয়ে কী করা হয়চিকিৎসক প্রথমে ব্যথার স্থান, কতদিন ধরে রয়েছে, ব্যথার তীব্রতা এবং পায়ের দিকে কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে—এসব বিষয়ে জানতে চান। এরপর শারীরিক পরীক্ষা করে পেশির শক্তি, অনুভূতি ও স্নায়ুর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হতে পারে।তবে সব রোগীর জন্য এক্স-রে বা এমআরআই প্রয়োজন হয় না। রোগীর উপসর্গ ও চিকিৎসকের শারীরিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে এসব পরীক্ষা করা হয়।প্রতিরোধে যা করবেনকোমরের সুস্থতা বজায় রাখতে কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—
দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে না থাকা
নিয়মিত বিরতি নিয়ে হাঁটাচলা করা
ভারী জিনিস তোলার সময় সতর্ক থাকা
দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটারে ঝুঁকে থাকা এড়িয়ে চলা
বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত সক্রিয় থাকা
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা
কর্মক্ষেত্রে সঠিক অঙ্গভঙ্গি বজায় রাখা
দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
চিকিৎসায় কী গুরুত্বপূর্ণসব ধরনের কোমরব্যথার চিকিৎসা এক নয়। ব্যথার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দীর্ঘস্থায়ী প্রাথমিক কোমরব্যথার ক্ষেত্রে রোগীকে স্বাস্থ্যশিক্ষা, শারীরিক কার্যক্রম, উপযুক্ত ব্যায়াম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বাসনভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।তাই নিজের ইচ্ছায় দীর্ঘদিন ওষুধ সেবন না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে পায়ে অবশভাব, ঝিনঝিন বা দুর্বলতা থাকলে এর কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
লেখক: ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি