রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোতে তীব্র গ্যাস সংকটে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাসাবাড়ি, সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং শিল্প-কারখানায় গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। গত এক সপ্তাহ ধরে চলা এ সংকট দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সময়সীমা জানাতে পারেনি জ্বালানি বিভাগ।রাজধানীর নতুন বাজার, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও ৩০০ ফুট সড়ক এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাসের চাপ থাকে না। কোথাও কোথাও গভীর রাতে সামান্য গ্যাস এলেও তা রান্নার জন্য যথেষ্ট নয়।নতুন বাজার এলাকার প্রাইভেটকার চালক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন জানান, অধিকাংশ সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ নেই। যেসব স্টেশনে কিছুটা গ্যাস মিলছে, সেখানে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষায় অতিষ্ঠ হয়ে তিনি আপাতত গাড়ি চালানো বন্ধ রেখেছেন।মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ফজলে রাব্বি সৌরভ বলেন, সারাদিন গ্যাস না থাকায় পরিবারের সদস্যদের রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। একই অভিযোগ করেন মিরপুরের বাসিন্দা সুকন্যা আমীর। তিনি বলেন, নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করেও গ্যাস না পাওয়ায় রান্নার জন্য বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে, এতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল গুনতে হচ্ছে।সংকট শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নয়। নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীর মতো শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের ঘাটতিতে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে সাভার ও গাজীপুরের বহু কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।এদিকে কমিশন বৃদ্ধির দাবিতে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ধর্মঘটের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্প্রতি পেট্রোবাংলার সঙ্গে বৈঠক হলেও এ বিষয়ে কোনো সমাধান হয়নি।কেন তৈরি হলো সংকটজ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালের একটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় আমদানিকৃত গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। শুরুতে সাময়িক সমস্যা মনে হলেও পরে ত্রুটিটি জটিল হওয়ায় মেরামতকাজ দীর্ঘায়িত হচ্ছে।বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, প্রথমে দেশীয় বিশেষজ্ঞরা সমস্যার উৎস শনাক্ত করতে পারেননি। পরে যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা বিশেষজ্ঞরা ত্রুটি শনাক্ত করে মেরামতের কাজ শুরু করেছেন। তবে সমস্যাটি প্রযুক্তিগতভাবে জটিল হওয়ায় কখন পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।স্থায়ী সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের প্রয়োজনবর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে নিজস্ব উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেনের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায় বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে একটি টার্মিনাল বিকল হলেই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে নতুন এফএসআরইউ স্থাপন, মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে।প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, নতুন কয়েকটি এফএসআরইউ স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এছাড়া স্থল ও সমুদ্রে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।সূত্র: বিবিসি বাংলা