জুলাই-আগস্ট গণআন্দোলন দমনে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রাখা, বলপ্রয়োগে উসকানি এবং কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার নির্দেশ দাতা হিসেবে অভিযুক্ত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা শুরু হয়েছে।আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুর পৌনে ২টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা শুরু করেন। এই রায়টি বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এবং চিফ প্রসিকিউটরের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে।এর আগে, গত ২২ জুন ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য আজকের দিনটি (৩০ জুন) ধার্য করেছিলেন। আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এবং আসামিপক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।৩৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র ও আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগগত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। ৩৯ পৃষ্ঠার মূল অভিযোগপত্রের সঙ্গে এক হাজার ৬Nz৯ পৃষ্ঠার নথিপত্র, তিনটি অডিও এবং ছয়টি ভিডিও ডকুমেন্ট জমা দেওয়া হয়। এই মামলায় হাসানুল হক ইনুকে একমাত্র আসামি করা হয়েছে।তার বিরুদ্ধে আনা মোট আটটি অভিযোগে বলা হয়েছে— তিনি আন্দোলনকারীদের ‘বিএনপি-জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলপ্রয়োগের উসকানি দিয়েছেন। একই সঙ্গে ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা হিসেবে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্ররোচনা এবং কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দিয়ে ছয়জনকে হত্যার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রেখেছেন।অভিযোগের মূল বিবরণসমূহ:১. বিদেশি গণমাধ্যমে উসকানিমূলক সাক্ষাৎকারঅভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই হাসানুল হক ইনু একটি বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি চলমান আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে ছাত্র-জনতাকে সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের উসকানি দেন।২. গণভবনের বৈঠকে সেনা মোতায়েন ও 'দেখামাত্র গুলি'র সিদ্ধান্ত১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলীয় জোটের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জাসদ সভাপতি হিসেবে ইনু ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। সভায় কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে দেশব্যাপী কারফিউ জারি, সেনা মোতায়েন এবং নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর ‘দেখামাত্র গুলি’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ইনুর সরাসরি প্ররোচনা ও সহায়তা ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।৩. কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোন ও ছয় হত্যা২০ জুলাই দুপুরে হাসানুল হক ইনু তার নিজ জেলা কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে (এসপি) ফোন করেন। তিনি আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরি ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন এবং আগের নির্যাতনগুলোকে অনুমোদন করেন। এই নির্দেশনার পর পুলিশ ও ১৪ দলের সশস্ত্র ক্যাডাররা ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়ায় ব্যাপক গুলি চালায়। এতে ৬ জন নিহত ও অসংখ্য মানুষ আহত হন। নিহতরা হলেন:
আশরাফুল ইসলাম (শ্রমিক)
সুরুজ আলী বাবু (শ্রমিক)
আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন (শিক্ষার্থী)
মো. উসামা (শিক্ষার্থী)
বাবলু ফরাজী (ব্যবসায়ী)
ইউসুফ শেখ (চাকরিজীবী)
৪. শেখ হাসিনার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও লেথাল ওয়েপন ব্যবহারের অনুমোদনঅভিযোগে বলা হয়েছে, আন্দোলন চলাকালে ইনু সার্বক্ষণিকভাবে শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। ২০ জুলাই ও ৪ আগস্ট শেখ হাসিনা কর্তৃক আন্দোলনকারীদের ঘেরাও করা, হেলিকপ্টার থেকে গুলি ও বোমা হামলা চালানো এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র (লেথাল ওয়েপন) ব্যবহারের সিদ্ধান্তগুলোকে তিনি নীতিগত অনুমোদন ও সহায়তা দেন।৫. গণমাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের বৈধতা প্রদান২৭ জুলাই একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসানুল হক ইনু সরকারের জারি করা কারফিউ এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন করেন। পরবর্তীতে ২৯ জুলাই ১৪ দলের আরেকটি সভায় জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব বাস্তবায়নে উসকানি দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চালানো হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিকভাবে বৈধতা দেন।৬. ৫ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ ও চূড়ান্ত সহিংসতা
৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে কুষ্টিয়ার হাজারো ছাত্র-জনতা হাসপাতাল মোড়ে জড়ো হন। অভিযোগ অনুযায়ী— শেখ হাসিনা, মাহবুবউল আলম হানিফ এবং হাসানুল হক ইনুর যৌথ পরিকল্পনা ও নির্দেশে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, জাসদ ও অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র ক্যাডাররা পুলিশের ছত্রছায়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে শহরের বক চত্বর, বার্মিজ গলি, হরিপুর রোড ও তুলাপট্টি এলাকায় উক্ত ছয়জন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।