বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, পলাশীর ট্র্যাজেডি শুধু ইতিহাসের একটি ঘটনা নয়; এর শিক্ষা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন স্তরে এখনো ‘মীর জাফরীয়’ চক্রান্ত ও বিশ্বাসঘাতকতার প্রবণতা বিদ্যমান রয়েছে।মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত ‘পলাশী দিবসের তাৎপর্য ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।গোলাম পরওয়ার বলেন, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। তবে পলাশী কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান বা ঐতিহাসিক যুদ্ধের নাম নয়; এটি বিশ্বাসঘাতকতা ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী ষড়যন্ত্রের প্রতীক।তিনি বলেন, “আজও পদ্মা, মেঘনা, যমুনা কিংবা বুড়িগঙ্গার তীরেও পলাশীর চক্রান্ত বিদ্যমান। নামের মীর জাফর হয়তো নেই, কিন্তু বিভিন্ন রূপে মীর জাফরীয় চরিত্রের মানুষ সমাজ ও রাষ্ট্রে অবস্থান করছে।”জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, পলাশীর পরাজয়ের মূল কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা। বাইরের শত্রুর চেয়ে ভেতরের শত্রুই জাতির জন্য বেশি বিপজ্জনক। ক্ষমতার লোভ ও ব্যক্তিস্বার্থের কারণে দেশ ও জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনাই পলাশীর ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছে।তিনি আরও বলেন, ১৭৫৭ সালের পরাজয় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিঃশেষ করতে পারেনি। বরং সেই বেদনাবিধুর অধ্যায় থেকেই নতুন স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে।বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, আধুনিক বিশ্বে আধিপত্যবাদ আর সরাসরি ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাই প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতিকে সতর্ক থাকতে হবে।সভায় সভাপতির বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম বলেন, ইতিহাস বারবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে। বিভিন্ন সময়ে ঘষেটি বেগম, উমিচাঁদ ও রায়দুর্লভের মতো চরিত্রের পুনরাবির্ভাব ঘটে, যারা ব্যক্তিস্বার্থে জাতিকে দুর্বল করে এবং বহিঃশক্তির স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রাখে।তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও বহুবার ‘মীর জাফরীয়’ চরিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এসব শক্তি দেশের জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিদেশি বা আধিপত্যবাদী শক্তির স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছে।নূরুল ইসলাম আরও বলেন, পলাশীর ট্র্যাজেডি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি এমন এক ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে অভ্যন্তরীণ বিভাজন, ক্ষমতার লোভ এবং স্বার্থান্বেষী রাজনীতি জাতির পরাজয়ের পথ তৈরি করেছে।অনুষ্ঠানে বিশেষ আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সালাহউদ্দিন আইউবী এমপি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন এবং লেখক-গবেষক ড. সায়ীদ ওয়াকিল।এ সময় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, সাহিত্য সম্পাদক সাইদুল ইসলাম, প্রকাশনা সম্পাদক আমিরুল ইসলাম, শিল্প ও সংস্কৃতি সম্পাদক আবু মুসা, বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমানসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।